বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে জমছে বাড়তি তহবিল, আর সেই উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশই এখন গড়াচ্ছে সরকারি ট্রেজারি বিলে। এর প্রভাবে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমেছে প্রায় সোয়া বেসিস পয়েন্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, নব্বই দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার আগের সপ্তাহের প্রায় সোয়া নয় শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে পৌনে নয় শতাংশে—দীর্ঘ সময় পর যা প্রথমবারের মতো নয় শতাংশের নিচে নামল।
একই ধারা দেখা গেছে দীর্ঘমেয়াদি বিলগুলোতেও। ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার সামান্য কমে সাড়ে নয় শতাংশের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে, আর এক বছর মেয়াদি বিলের সুদহারও কমতির দিকে, বর্তমানে যা সোয়া নয় শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত দুটি কারণে এই সুদহার কমছে। প্রথম কারণ হলো, ব্যাংকিং খাতে এখন যথেষ্ট বাড়তি তারল্য থাকলেও সেই তুলনায় বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কম। বিশেষত দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অব্যবহৃত তহবিল জমা হয়ে আছে। গত এক বছরে মে মাস পর্যন্ত এসব ব্যাংকের আমানত সাড়ে এগারো শতাংশের মতো বেড়েছে বলে জানা গেছে।
আমানতের ওপর তুলনামূলক আকর্ষণীয় সুদহারের কারণে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আমানত সংগ্রহের প্রবণতা বেশ ইতিবাচক ছিল। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে বাড়তি অর্থের জোগান বেড়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম লাভজনক জায়গা হয়ে উঠেছে ট্রেজারি বিল, যেখানে এখনো নয় শতাংশের বেশি নিশ্চিত মুনাফা মিলছে। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশি আমানত পাওয়া বেশ কিছু শীর্ষ ব্যাংক তাদের বিনিয়োগ ট্রেজারি বিলের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। এতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক নিয়মেই সুদহার কমতে শুরু করেছে।
আমানত প্রবৃদ্ধি ভালো হওয়ায় আগস্ট মাস থেকে দেশের বেশ কয়েকটি প্রধান ব্যাংক তাদের আমানতের সুদহার আধা থেকে এক শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি।
ব্যাংকাররা জানান, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মূল বিনিয়োগকারী মূলত ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত তহবিল এসব নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের ওপর নয় শতাংশ সুদসীমা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক একটি নতুন সুদহার কাঠামো চালু করেছিল। এরপর থেকেই মূলত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুদিন আগেও এতটাই তীব্র ছিল যে গত অর্থবছরের এক পর্যায়ে সুদহার বারো শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ব্যাংকাররা জানান, ইতিহাসে এর আগে কখনো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগ এতটা বাড়েনি।
সংশ্লিষ্ট সময়ের মাসভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনো কোনো মাসে সুদহার বারো শতাংশের কাছাকাছি বা তারও বেশি ছিল, যখন একই সময়ে ব্যাংকভেদে আমানতের সুদহার ছিল নয় থেকে এগারো শতাংশের মধ্যে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই নিম্নমুখী প্রবণতা প্রমাণ করে যে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে না বাড়লে এই বাড়তি তারল্য প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত না হয়ে শুধু সরকারি সিকিউরিটিজেই আবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

