বাংলাদেশে স্মার্টফোন এখন আর শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, কেনাকাটা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু দেশের একটি বড় অংশ এখনো স্মার্টফোনের বাইরে। দামের কারণে অনেক মানুষ পুরোনো ধরনের সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। এই বাস্তবতায় স্মার্টফোনকে আরও সাশ্রয়ী করতে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশের সব ব্যাংকে শিগগিরই মোবাইল ফোন কেনার জন্য কিস্তি সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। ফলে বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো পর্যায়ক্রমে মোবাইল ফোন কেনার ক্ষেত্রে কিস্তির সুবিধা চালু করতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু মোবাইল ফোন বিক্রি বাড়ানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থায় আরও বেশি মানুষকে যুক্ত করার প্রশ্ন। কারণ স্মার্টফোনের দাম কমানো গেলে এবং একবারে পুরো অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে কিস্তিতে কেনার সুযোগ তৈরি হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের একটি বড় অংশও স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্যাপক হলেও স্মার্টফোনের ব্যবহার এখনো সবার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তিসম্পন্ন সাধারণ ফোন ব্যবহার করেন।
এই তথ্যটি ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত হয় না। ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত যন্ত্রও প্রয়োজন। একটি সাধারণ ফোনে কল ও খুদে বার্তা চালাচালি সম্ভব হলেও অনলাইন শিক্ষা, ভিডিও যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং, সরকারি অনলাইন সেবা, ই-কমার্স কিংবা বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
ফলে স্মার্টফোনের উচ্চমূল্য অনেক মানুষের জন্য এক ধরনের ডিজিটাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এখন সেই বাধা কমানোর দিকেই নজর দিচ্ছে।
স্মার্টফোনের দাম কমানোর বিষয়টি নিয়ে বাজেটের আগে স্থানীয় ১৪টি মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন রেহান আসিফ আসাদ। লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে কম দামের স্মার্টফোনের মূল্য ১০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার টাকার কাছাকাছি নিয়ে আসা।
তবে বাস্তব উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় স্থানীয় প্রস্তুতকারকেরা পরে জানিয়েছেন, একটি সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু প্রস্তুতকারকেরা দাম কমালেই স্মার্টফোন সবার নাগালে আসবে না। ফোনের দাম, কর, কাঁচামালের মূল্য, আমদানি ব্যয়, মুনাফা, বিপণন খরচ এবং ক্রেতার অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা—সবকিছুর ওপর চূড়ান্ত দাম নির্ভর করে।
সরকার তাই কম দামের ফোন তৈরির পাশাপাশি কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্কের চাপ কমানোর কথাও বলছে। রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, কম দামের মোবাইল ফোন তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালে শূন্য কর ও শুল্ক দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
এটি কার্যকর হলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি ফোনের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্মার্টফোনের দাম কমানো সেই দরজা খোলার প্রথম ধাপ হতে পারে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে মানুষ কতটা সহজে ঢুকতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে কিস্তির শর্ত, ইন্টারনেটের দাম, নেটওয়ার্কের মান এবং ডিজিটাল সেবার সহজলভ্যতা। সরকারের সামনে এখন তাই শুধু স্মার্টফোন সস্তা করার কাজ নয়—একটি এমন ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির চ্যালেঞ্জ, যেখানে প্রযুক্তি কেবল শহর বা সামর্থ্যবান মানুষের সুবিধা হয়ে না থেকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুযোগের অংশ হয়ে উঠবে।

