গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন যখন একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে, তখন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলে ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দিতে প্রাথমিকভাবে সম্মতি দিয়েছে দেশের ১৭টি ব্যাংক। চলতি সপ্তাহেই এসব ব্যাংকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে ইতিমধ্যে বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে। এই বাস্তবতা মোকাবেলায় গত মে মাসের শেষদিকে এই বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে, আর বাকি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা যোগান দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। পুরো তহবিলের মধ্যে বিশেষভাবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে শুধুমাত্র বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য, যেখান থেকে বেসরকারি খাত গড়ে সাড়ে সাত শতাংশ সুদে ঋণ পাবে।
ইতিমধ্যে এই প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ বিতরণে মোট ৩৭টি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, মূল সমস্যা—অর্থাৎ জ্বালানি সংকট—সমাধান না করে শুধু অর্থায়নের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু করা আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত। তাঁদের যুক্তি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে যেখানে চালু থাকা কারখানাগুলোই উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বছরের পর বছর বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠান সচল করে টেকসই উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।
এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের একাংশের মত হলো, নতুন করে বন্ধ কারখানায় বিনিয়োগের পরিবর্তে বর্তমানে সচল থাকলেও সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সহায়তা দেওয়া উচিত। এমনটা না হলে ভবিষ্যতে নতুন করে ঋণখেলাপি বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন, নিটওয়্যার খাতের একটি সংগঠনের সদস্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক সময় প্রায় দুই হাজার থাকলেও তা কমে বর্তমানে মাত্র আটশোর কাছাকাছি নেমে এসেছে। এমনকি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি সোয়েটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গত এক বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কম সুদের ঋণের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা গেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, ঋণ বিতরণের আগে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা যাচাই, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং কঠোর তদারকি অপরিহার্য। পাশাপাশি শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও একই সঙ্গে জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
প্রণোদনা তহবিলে অর্থায়নে সম্মত হওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক। এর মধ্যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এককভাবে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর আরও দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দেবে দুই হাজার কোটি টাকা করে। তবে চলমান আর্থিক সংকটের কারণে বেশ কিছু ব্যাংক এই তহবিলে অর্থ দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিল্প খাতে প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু সহজ শর্তে ঋণ যথেষ্ট নয়—গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও একই সঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া শুধু কম সুদে ঋণ দিয়ে কারখানা সচল রাখা বাস্তবে সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, এই প্রণোদনা প্যাকেজ শিল্প খাতে সাময়িক স্বস্তি আনলেও এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে জ্বালানি সংকটের প্রকৃত সমাধান এবং তহবিল ব্যবহারে কঠোর জবাবদিহির ওপর।

