প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের প্রতিটি বড় ঋণগ্রহীতার জন্য আলাদা ও সময়সীমাবদ্ধ ঋণ আদায় পরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ও পরিচালন পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক অগ্রগতি, বিদ্যমান সমস্যা, সম্ভাবনা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনার অংশ হিসেবে এসব বৈঠক করছে বিভাগটি।
বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, জামানত, একই গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ, আইনি অবস্থা এবং সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা যাচাই করার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই শ্রেণিকৃত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব খেলাপি ঋণের বড় অংশ অল্পসংখ্যক বৃহৎ ঋণগ্রহীতার কাছে কেন্দ্রীভূত। ফলে এটি শুধু খেলাপি ঋণের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে ঋণ কেন্দ্রীভবন ও সুশাসনের সমস্যাও জড়িত।ঋণ আদায়ের সাফল্যের সঙ্গে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি সরাসরি যুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট খাত বা বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ঋণ বিতরণের আগে একই গোষ্ঠীর মোট ঋণ, প্রকৃত মালিকানা, ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ, পরিশোধ সক্ষমতা, খাতভিত্তিক ঋণের ঘনত্ব এবং ঋণ দেওয়ার পর তদারকি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঋণের পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনা এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, নারী উদ্যোক্তা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে মানসম্মত ঋণ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ঋণ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সম্পদের গুণগত মানে কোনো ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ মামলা-মোকদ্দমায় আটকে থাকার বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, শুধু মামলা করাকে ঋণ আদায়ের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বড় মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা, আদালতের রায়, রায় কার্যকরের পর্যায়, জামানতের অবস্থা এবং অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া ব্যাংকের সম্পদ উদ্ধারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাজমা মোবারেক বলেন, জনতা ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ আদায়, মুনাফায় ফেরা, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বৃদ্ধি, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্যালান্সশিট পুনর্গঠন এবং পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি মূলধন পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিতে হবে।
সরকারের কাছ থেকে মূলধন সহায়তার প্রয়োজন হলে তা পরিমাপযোগ্য সংস্কার ও নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৫.৩৯ বিলিয়ন টাকা। এতে ব্যাংকটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি রেকর্ড ৬৪৪.০৬ বিলিয়ন টাকা এবং শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ঘাটতি ৫৫৯.৩২ বিলিয়ন টাকাতে পৌঁছায়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ৩৯.৩১ বিলিয়ন টাকা। মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমও গভীর সংকটে ছিল। সুদ থেকে আয় ও ব্যয়ের হিসাবেও ব্যাংকটি ৫৯.০৩ বিলিয়ন টাকা লোকসান করে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজিবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর জোর চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ঋণ আদায়ের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং এসব টাস্কফোর্সের বৈঠকে ঋণগ্রহীতাদের ডেকে ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকটি নতুন হিসাব খোলা এবং নতুন ব্যবসা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহও এখন আর করছে না ব্যাংকটি।

