প্রায় ষাট হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং উচ্চ সুদহারের কারণে থমকে থাকা বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আমানত সংকটের প্রসঙ্গও। কমিটির মূল্যায়ন হলো, শুধু সুদের হার ওঠানামা করিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়— বরং ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতার অভাব, খেলাপি ঋণের প্রকৃত কারণ এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমিটির সদস্যরা কেবল নীতি সুদহার বাড়ানো-কমানো নিয়েই আলোচনা করেননি। বরং তারা গভীরভাবে জানতে চেয়েছেন, ঋণের অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোথায় যাচ্ছে, কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী, খেলাপি ঋণ তৈরির পেছনের প্রকৃত কারণ কী এবং রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না।
গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বৈঠকের কয়েক দিন পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার দশ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে নয় শতাংশে নামিয়ে আনে, যা আগস্টের শুরু থেকে কার্যকর হয়েছে।
বৈঠকের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রায় ষাট হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা তহবিল। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ এবং বন্ধ বা রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল পঁচিশ লাখেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে কমিটির সদস্যরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
খেলাপি ঋণের প্রশ্নেও কমিটি বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, খেলাপি ঋণের দায় আসলে কার। শুধু ঋণগ্রহীতাকেই দায়ী করা ঠিক হবে কি না, নাকি ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা বা পরিচালকদেরও এই দায়ের মধ্যে আনা উচিত— এই প্রশ্নে তারা আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছেন। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় বেশ কিছু ব্যাংকে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি করছে।
সুদহার নিয়েও বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। একাধিক সদস্য মনে করেন, উচ্চ সুদহার বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দ্রুত সুদহার কমানোর পাশাপাশি তা এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি, কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও মূল্যস্ফীতির একটি বড় কারণ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে নীতিগত সাংঘর্ষিকতা নিয়েও— একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে— এই দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় কতটা আছে। কমিটি সতর্ক করে বলেছে, অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, আবার অতিরিক্ত কড়াকড়ি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এজন্য একটি সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণের সুপারিশ করেছে তারা।
কমিটির একজন সদস্য এই প্রণোদনার অর্থায়ন কাঠামো নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এই বিপুল অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতিতে কী প্রভাব পড়বে এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান আসলে কতটা হবে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রণোদনার অর্থ যদি সঠিকভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান খাতে ব্যবহৃত না হয়ে অন্য কোথাও চলে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফলের বদলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
ইসলামি ব্যাংকিং খাত নিয়েও একাধিক সুপারিশ এসেছে বৈঠক থেকে। এই খাতকে মুদ্রানীতির মধ্যে আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, অতীতের অনিয়মগুলোর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং শরিয়াহ বোর্ডের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় নিয়মিত পরিদর্শন যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে কমিটি। এ কারণে বেশ কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিশেষ অডিট পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা, যাতে কাগজে-কলমের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদমানের পার্থক্য থাকলে তা সামনে আসে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্তকরণ, সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী কে— তা চিহ্নিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
মুদ্রানীতি পর্যালোচনার সময়সীমা নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে বৈঠক থেকে। এখন থেকে ছয় মাস পরপর নয়, বরং প্রতি তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের মুদ্রানীতি এখন সংসদীয় নজরদারির অনেক ঘনিষ্ঠ পরিসরে চলে এসেছে। ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত তুলনামূলক তথ্য ও কার্যপত্র চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কঠোর সংসদীয় তদারকি দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের পদক্ষেপের ওপর।

