সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক মতামতে বিপাশা চক্রবর্তী বিষয়টিকে প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার একটি সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—কীভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক কাগজপত্র, করপোরেট কাঠামো এবং গ্ল্যামার জগতের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্তরে ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি এবং তার সাথে যুক্ত এক সিনেমা প্রযোজকের খবর নিশ্চয়ই আপনাদের চোখে পড়েছে? ভুয়া কাগজ বানিয়ে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে ফেলা হলো! আর সেই টাকায় ঢাকায় সিনেমা বানানো হলো! উঠতি নায়িকাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি উপহার দেওয়া হলো! আপাতদৃষ্টিতে এটাকে সাধারণ কোনো স্ক্যান্ডাল মনে হতে পারে। কিন্তু ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং।
আসুন খুব সহজে বুঝি। এই প্রক্রিয়ায় প্রক্সিরা ঠিক কী কী ভূমিকা পালন করে? আইসোলেশন লেয়ার মানে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করা হয় প্রথমেই। ব্যাংক থেকে লুণ্ঠিত রক্তঘামানো টাকা সরাসরি কোনো গডফাদারের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে যায় না। প্রক্সিরা নিজেদের ভুয়া রপ্তানি প্রতিষ্ঠান, ভুয়া এলসি LC কিংবা ডামি কোম্পানির নাম ব্যবহার করে সেই টাকা বের করার রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়।
ক্লিনিং হাউস হিসেবে মিডিয়া ও গ্ল্যামার জগতকে এক্ষেত্রে বেছে নেয়া হয়েছে। ব্যাংকের অংকটা এত বড় যে তা শুধু জমি-জমা কিনে বা ব্যাংকে রেখে লুকিয়ে রাখা যায় না। তাই বিনোদন জগত, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বা গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডকে বেছে নেওয়া হয় ‘ক্লিনিং হাউস’ হিসেবে। প্রক্সিদের মাধ্যমে ঢালাওভাবে সিনেমায় টাকা ঢেলে সেই অবৈধ ক্যাশ টাকাকে বৈধ বিনিয়োগ হিসেবে চালানোর চেষ্টা চলে।
উপহারের আড়ালে সম্পদ বণ্টন করা হয়! প্রক্সিদের ধরে রাখার জন্য এসব করা হয়। এইক্ষেত্রে প্রক্সি হচ্ছে সোশাল মিডিয়া বিনোদন সাংস্কৃতিক জগতের জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিরা। তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংক লুটের টাকায় কেনা ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি ও গোল্ড উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে অবৈধ অর্থের ট্রানজিট পয়েন্ট তৈরি করা হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও আসল সত্যটা একই থেকে যায়। প্রক্সিরা যতই গ্ল্যামার বা কাগজের ছদ্মবেশের পেছনে লুকাক না কেন ফোরেন্সিক অডিট আর বায়োমেট্রিক ডাটাবেজের কাছে সব ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট জমা থাকে।
ক্ষমতার পাটাতন যখন কেঁপে ওঠে কিংবা ব্যাংক অডিট যখন শুরু হয় তখন পেছনের গডফাদাররা ঠিকই ছায়া হয়ে যায়। আর ব্যাংকিং কাগজপত্র ও দলিলে স্বাক্ষর থাকা প্রক্সিদের নামটাই আদালতের চার্জশিটে ১ নম্বর আসামি হিসেবে উঠে আসে।ব্যাংক ভাঙুক আর সীমান্ত পারের চোরাচালান চলুক এই প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতিকে কোনোদিনই রক্ষা করা সম্ভব নয়।
আব্দুল আজিজ, জাজ মাল্টিমিডিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকা নির্দিষ্ট কর্মকর্তা এবং উপহারসুবিধা নেওয়া রূপালী জগতের সেই চরিত্রগুলো সবাই মূলত একটি বিশাল মাল্টি-লেয়ার প্রক্সি চেইন এর একেকটি অংশ। এই সিন্ডিকেটে কে কোন স্তরের প্রক্সি হিসেবে কাজ করেছে সংক্ষেপে বুঝি চলুন।
ক্ষমতার পাটাতন যখন কেঁপে ওঠে কিংবা ব্যাংক অডিট যখন শুরু হয় তখন পেছনের গডফাদাররা ঠিকই ছায়া হয়ে যায়। আর ব্যাংকিং কাগজপত্র ও দলিলে স্বাক্ষর থাকা প্রক্সিদের নামটাই আদালতের চার্জশিটে ১ নম্বর আসামি হিসেবে উঠে আসে।ব্যাংক ভাঙুক আর সীমান্ত পারের চোরাচালান চলুক এই প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতিকে কোনোদিনই রক্ষা করা সম্ভব নয়।
আব্দুল আজিজ, জাজ মাল্টিমিডিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকা নির্দিষ্ট কর্মকর্তা এবং উপহারসুবিধা নেওয়া রূপালী জগতের সেই চরিত্রগুলো সবাই মূলত একটি বিশাল মাল্টি-লেয়ার প্রক্সি চেইন এর একেকটি অংশ। এই সিন্ডিকেটে কে কোন স্তরের প্রক্সি হিসেবে কাজ করেছে সংক্ষেপে বুঝি চলুন।
প্রথম স্তর হিসেবে আব্দুল আজিজ ও তার গ্রুপ এর নাম আসে। ব্যাংকিং নথিতে এম এ আজিজ বা ক্রিসেন্ট গ্রুপ নিজেদের বড় ব্যবসায়ী হিসেবে জাহির করলেও তারা মূলত নেপথ্যের মূল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক গডফাদারদের টাকা তোলার প্রাথমিক প্রক্সি। ভুয়া এলসি, ভুয়া রপ্তানি কাগজ নিজের এনআইডি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার আইনি ঝুঁকিটি তারা নিজেদের কাঁধে নেয়।
দ্বিতীয় স্তরে আসে Corporate & Operational Proxies অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা। ব্যাংকের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা এবং কোম্পানির লজিস্টিকস সামলানো পরিচালকরা ছিলেন অপারেশনাল প্রক্সি। ভুয়া ভাউচার পাস করা, পরিদর্শন রিপোর্ট ম্যানিপুলেট করা এবং কাগজের জালিয়াতিকে বৈধতা দেওয়ার কাজটা তারা টাকার বিনিময়ে ক্লিয়ার করে দিয়েছে। তৃতীয় স্তর হলো Asset & Glamour Proxies মানে উপহারপ্রাপ্ত নায়ক নায়িকা ও সুবিধাভোগী।
গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের যেসব তারকা ব্যাংক লুটের টাকায় কেনা কোটি টাকার ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি কিংবা বিদেশ ভ্রমণের সুবিধা গ্রহণ করেছেন তারা হলেন অ্যাসেট প্রক্সি বা লাক্সারি বাফার। গডফাদার বা প্রাথমিক প্রক্সিরা সরাসরি নিজেদের নামে স্থাবর সম্পত্তি না রেখে এদের উপহার হিসেবে দেয়। এর মাধ্যমে সেই সম্পদ ও লুণ্ঠিত টাকা বিভিন্ন চ্যানেলে ছড়াতে ও লুকোতে ব্যবহার করেছে এবং এইভাবে বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক তারকাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার হাতিয়ার বানানো হয়।
অপরাধের এই চেইনে পেছনের আসল সিদ্ধান্তদাতারা সবসময় সুরক্ষিত দূরত্বে থাকে। কিন্তু তদন্তের মুখোমুখি যখন হতে হয় তখন এনআইডি নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম এবং রেজিস্ট্রেশন কার্ডে নাম থাকা এই প্রক্সিরাই প্রথম বলির পাঁঠা হয়।
প্রযোজক আজিজ থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট গাড়ির সুবিধা নেওয়া প্রক্সিরা ভেবেছিল গ্ল্যামার আর ক্ষমতার ছায়ায় তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু আইনি নথিপত্রে তাদের বায়োমেট্রিক ও ডিজিটাল সই থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত ফোরেন্সিক অডিটে তাদের প্রতিটি লেনদেনই অপরাধের সরাসরি আলামত হিসেবে চিহ্নিত হয়।

