বিশ্বের অন্যতম বড় মুক্ত বাণিজ্য জোট আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (RCEP) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। তবে সদস্যপদ পাওয়ার আগে বাণিজ্য আলোচনা, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য সুবিধা-চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত RCEP মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ, চিলি, হংকং ও শ্রীলঙ্কার সদস্যপদ আবেদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ কার্যকরী দল গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ দুই বছরেরও বেশি আগে RCEP-এ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুমোদনের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেয়।
LDC বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা ধরে রাখার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ RCEP-এ যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, RCEP-এ যোগ দিতে পারলে বাংলাদেশ ১৫ সদস্যের বড় একটি বাজারে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, RCEP-এ যোগদানের প্রক্রিয়ায় কার্যকরী দল গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার মতে, ১৫টি দেশের এই জোটে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, LDC উত্তরণের পর বাজার সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সদস্য হওয়ার আগ্রহ থাকলেই হবে না; আলোচনার জন্য বাংলাদেশকে বিস্তারিত প্রস্তুতি নিতে হবে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (RAPID) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, RCEP-এ যোগদানের আগে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে হবে—দেশের শিল্প ও অর্থনীতি এই চুক্তির মাধ্যমে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার জন্য কতটা প্রস্তুত।
তার মতে, সরকারকে আগে গবেষণা করে জানতে হবে বাংলাদেশ কী সুবিধা দিতে পারবে এবং আলোচনায় কী ধরনের অবস্থান নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, RCEP সদস্য দেশগুলোর শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে এই দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে RCEP সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের কাছ থেকে আরও বেশি বাজার সুবিধা বা শুল্ক কমানোর দাবি তুলতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (BFTI) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, সদস্য হওয়ার আগে একটি পূর্ণাঙ্গ লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তার মতে, শুল্ক কমানো হলে স্থানীয় শিল্প কী ধরনের প্রভাবের মুখে পড়বে এবং বিদেশি পণ্যের প্রবেশ কতটা বাড়বে—এসব বিষয় আগে যাচাই করা দরকার।
RCEP কী?
RCEP হলো ১৫টি দেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ১০টি আসিয়ান দেশ, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ড।
২০১২ সালে এই চুক্তির আলোচনা শুরু হয় এবং ২০২০ সালের নভেম্বরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ভারত আলোচনায় অংশ নিলেও ২০১৯ সালে প্রক্রিয়া থেকে সরে যায়।
অর্থনৈতিক আকারের দিক থেকে RCEP বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য জোট। এই জোটের সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, RCEP-এ যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে প্রবেশের নতুন সুযোগ পেতে পারে। তবে সফল সদস্যপদের জন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, শিল্প প্রস্তুতি এবং কার্যকর বাণিজ্য কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

