খোলাবাজারে ডলারের দাম টানা কমতে থাকায় দীর্ঘ তিন মাস পর আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কেনার পথে হাঁটল বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার নিলামের মাধ্যমে চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৫ কোটি মার্কিন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রতি ডলারের দর ধরা হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এর আগে সবশেষ গত ২০ মে বাজার থেকে ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের দরে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। এদিন ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউস থেকে প্রতি ডলার কিনেছে ১২২ টাকা ৩০ থেকে ৪০ পয়সা দরে, আর আমদানি বিল বা এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১২২ টাকা ৫০ থেকে ৬০ পয়সার মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাজারে প্রবেশকে অনেকেই দেখছেন দরপতন ঠেকানোর একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে।
একটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যত বাজারকে জানিয়ে দিয়েছে যে দাম এর নিচে নামতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও একবার দরপতনের সময় ব্যাংকগুলো ধারণা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো তখনই বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। তবে সে সময় হস্তক্ষেপ আসেনি, কারণ গত মাসের ২০ তারিখের পর সরকারি এলসি পরিশোধের খাতে নতুন করে আরও ১০ কোটি ডলার যুক্ত হয়ে যায়, যার ফলে সরকারি পেমেন্টের চাপ একাই ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এই বাড়তি চাপের কারণেই সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা থেকে বিরত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত পনেরো দিনে ডলারের দরে যে ধরনের ওঠানামা হয়েছে, তাতে ব্যাংকার ও গ্রাহক উভয়ের মধ্যেই একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষত অনেক গ্রাহক এখন আগেভাগেই ডলারের দর বেঁধে রাখতে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের অনুরোধ জানাচ্ছেন।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর হাতে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে, পাশাপাশি আমদানি বিল পরিশোধের চাপও আগের তুলনায় কমেছে। এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার সামগ্রিক চাহিদাও কমতির দিকে। এই সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্যহীনতার কারণেই মূলত ডলারের দরে পতন দেখা দিয়েছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারে দরপতন যাতে আরও না বাড়ে, সে বিবেচনা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ব্যাংকারদের ধারণা।
তবে সামনের মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কিছু বকেয়া অর্থ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে, যার প্রভাবে ডলারের চাহিদা আবার কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন একজন ব্যাংকার।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনবে— এমন কোনো আভাস সকালে বাজারে ছিল না। সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্ত সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু এবার তা জানানো হয় দুপুর ১টার দিকে। ফলে সকালের দিকে অনেক ব্যাংক না জেনেই তুলনামূলক কম দরে, অর্থাৎ ১২২ টাকা ৫০ থেকে ৬০ পয়সায় এলসি নিষ্পত্তি করে ফেলে এবং রেমিট্যান্সও কম দরে সংগ্রহ করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুপুরে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কেনার পর বিকেলে বাজারে দর কিছুটা বেড়ে যায়। এরপর অনেক ব্যাংক একই দরে রেমিট্যান্সের ডলার কেনা ও এলসি নিষ্পত্তি— দুটোই করেছে। ব্যাংকারদের ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যত একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছে যে, ডলারের দর ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার নিচে নামতে দেওয়া হবে না।
আরেকজন ব্যাংক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, নিলামের বিষয়টি আগে থেকে জানা থাকলে সকালে এত কম দরে কোনো ব্যাংকই রেমিট্যান্সের ডলার কিনত না বা এলসি নিষ্পত্তি করত না। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহের রোববার থেকে ডলারের দর ফের কমতে শুরু করেছিল, অথচ তখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে দর শেষ পর্যন্ত কোথায় স্থির হবে, তা নিয়ে বাজারে একধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত সপ্তাহের শেষ দিকে ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল, আবার তার মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই তা নেমে এসেছিল ১২২ টাকায়। অর্থাৎ গত পনেরো দিনের মধ্যে ডলারের বাজারদরে বেশ বড় ধরনের ওঠানামা লক্ষ করা গেছে, যা সামগ্রিকভাবে মুদ্রাবাজারে অনিশ্চয়তার একটি চিত্র তুলে ধরছে।

