দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন দীর্ঘদিন ধরে চাপ ও স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই উল্টো চিত্র দেখা গেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা আগের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়। এই বিপুল অঙ্কের মুনাফা এখন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক বৈঠকে চলতি অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের গভর্নর। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো মুনাফা অর্জনকে মূল লক্ষ্য ধরে কাজ করে না। তবে ঋণ কার্যক্রম ও বিনিয়োগ থেকে আসা সুদজনিত আয়ের কারণে এবার মুনাফার অঙ্কটি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠেছে।বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারের কৌশলই এবারের মুনাফা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আয় করেছে ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বেশি, আর কমিশন ও ডিসকাউন্ট বাবদ যোগ হয়েছে আরও ২৭৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই দুই খাত মিলিয়ে আয় ছিল ৭ হাজার ৭০২ কোটি টাকা—অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই এখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আয় বেড়েছে।
এর পাশাপাশি সরকার ও দেশের ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দিয়েও মোটা অঙ্কের সুদ আয় হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। রাজস্ব আদায়ের গতি কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। এই ঋণ থেকে সুদ বাবদ আয় হয়েছে ২১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে কমিশন, ডিসকাউন্ট, লভ্যাংশ ও অন্যান্য আয় যোগ করলে টাকা ধার দেওয়া বাবদ মোট আয় দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা, যদিও আগের অর্থবছরে এই খাতে আয় ছিল কিছুটা বেশি—২৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট আয় দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
আয়ের পাশাপাশি ব্যয়ের খাতগুলোও লক্ষণীয়। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিদেশে থাকা হিসাব পরিচালনা এবং স্বর্ণ মজুত রাখার জন্য ভাড়া বাবদ খরচ হয়েছে ২ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। দেশীয় মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে ৪৭৯ কোটি টাকা, নতুন টাকা ছাপাতে খরচ হয়েছে ৪৫৯ কোটি টাকা, আর সাধারণ ও প্রশাসনিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কম—আগের বছর এই ব্যয় ছিল ৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।
আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে মুনাফা দাঁড়ায় ২৬ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এরপর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ছয় গুণ সমপরিমাণ বিশেষ প্রণোদনা বোনাস পরিশোধের পর চূড়ান্ত নিট মুনাফা দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এক শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, দেশের মুদ্রা ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় সেখান থেকে বিনিয়োগজনিত মুনাফা আসাটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে তাঁর মতে, প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটি কতটা সফলভাবে করতে পারছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, দেশের একাধিক ব্যাংক এখনো গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে, আর এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কী ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিজার্ভের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সরকার ও ব্যাংকগুলোকে ঋণদানের মাধ্যমেই এই বাড়তি আয় সম্ভব হয়েছে। তবে তাঁরা এটাও স্বীকার করছেন, অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে চললে এবং ব্যাংকিং খাত ঘন ঘন তারল্য সংকটে না পড়লে এত বিপুল মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতো না।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুনাফা বৃদ্ধিকে শুধু ইতিবাচক সাফল্য হিসেবে না দেখে, এর পেছনের কাঠামোগত কারণ—বিশেষত সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা ও ব্যাংক খাতের সংকট—নিয়েও গভীরভাবে পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন।

