দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি আরও বাড়াতে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণ সুবিধা—যাকে বলা হচ্ছে ই-পেমেন্ট ক্রেডিট—চালুর নির্দেশ দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সুবিধার মূল বৈশিষ্ট্য হলো, গ্রাহককে সুদের বদলে একটি নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করতে হবে, আর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
গত রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকরা এখন থেকে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচ, যাতায়াত ও টিকিটের ব্যয়, সরকারি কর ও ফি, আমানতের কিস্তি, বীমার প্রিমিয়ামসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত নানা খাতের বিল এই ঋণসুবিধার আওতায় পরিশোধ করতে পারবেন।
ঋণের অঙ্ক ও মেয়াদের ভিত্তিতে ফি কাঠামোও নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেমন ৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে কেউ ঋণ নিলে ৭ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৪ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ৬ টাকা ফি দিতে হবে। আবার তুলনামূলক বড় অঙ্কের ঋণ, অর্থাৎ ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৭০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সার্কুলারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ঋণ নেওয়ার ৮তম, ১৬তম বা ৩১তম দিনের মধ্যে আসল অর্থ ও প্রযোজ্য ফি একসঙ্গে শোধ করতে হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ঋণের টাকা সরাসরি সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার কাছে অনুমোদিত ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যাবে। কোনোভাবেই এই অর্থ নগদে রূপান্তর করা, গ্রাহকের মোবাইল ওয়ালেটে জমা করা কিংবা অন্য কোনো ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেওয়া যাবে না।
গ্রাহকের জন্য সুখবর হলো, চাইলে তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেও পুরো ঋণ শোধ করে দিতে পারবেন, আর এ জন্য বাড়তি কোনো জরিমানা, সুদ কিংবা ফোরক্লোজার চার্জ কেটে নেওয়া যাবে না। তবে উল্টো চিত্রও আছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে বিলম্বের প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট হারে জরিমানা বা ফি আরোপ করা যাবে, যদিও তার একটি ঊর্ধ্বসীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহককে ঋণের ধরন, পরিমাণ, ফি, মেয়াদ ও পরিশোধের নিয়মসহ যাবতীয় শর্ত সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকের আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতেও ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগী হতে বলা হয়েছে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংকগুলোকে বিকল্প ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার এবং ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণসীমা ঠিক করার কথা বলা হয়েছে। গ্রাহক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে—নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে ডিজিটাল অনবোর্ডিং সম্পন্ন করতে হবে, আর ওটিপি, দুই স্তরের যাচাইকরণ বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো নিরাপদ পদ্ধতিতে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
এই সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলো চাইলে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর কিংবা অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সেবা চ্যানেলও ব্যবহার করতে পারবে। তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে—গ্রাহক ও ঋণসংক্রান্ত সব তথ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত ডেটা সেন্টারে সংরক্ষণ করতে হবে এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এখনই পুরোদমে এই সেবা চালু হচ্ছে না। বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে প্রতিটি ব্যাংককে অন্তত ছয় মাস পাইলট আকারে এই কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনা করতে হবে। পাইলট পর্বের ফলাফল মূল্যায়নের পর তা ইতিবাচক প্রমাণিত হলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সবুজ সংকেত পেলে তবেই বাণিজ্যিকভাবে সেবাটি চালু করা যাবে। এরপর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পাইলটের মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও অনুমোদিত প্রোডাক্ট প্রোগ্রাম গাইডলাইন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ছোট অঙ্কের জরুরি প্রয়োজনে সুদভিত্তিক ঋণের বদলে স্বল্প ফি-ভিত্তিক এই ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক সহজ ও স্বচ্ছ একটি বিকল্প হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং গ্রাহক-তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।

