দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে টাকা ফেরত পেতে শুরু করেছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা। পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। প্রথম দিনেই প্রায় ছয় হাজার গ্রাহকের হাতে মোট আড়াইশ কোটি টাকা তুলে দিয়েছে ব্যাংকটি, যা দীর্ঘদিন সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মোড় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু নগদ অর্থ ফেরতই নয়, একই দিনে অনলাইনে টাকা স্থানান্তরের সুবিধাও চালু করেছে ব্যাংকটি। ফলে বহুদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংককে একত্র করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পরও এখনো পুরনো পাঁচটি ব্যাংকের শাখাগুলো নিজ নিজ পরিচয়ে আলাদাভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সারাদেশে এই পাঁচ ব্যাংক মিলিয়ে মোট শাখার সংখ্যা সাতশ একষট্টিটি।
আমানত ফেরত দেওয়ার আগে গত এক থেকে ছয় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে আগ্রহী গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করা হয়। এরপর সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ধরনের আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় সোমবার থেকে। গ্রাহকেরা তাঁদের নিজ নিজ শাখা থেকে গিয়ে টাকা তুলছেন।
গ্রাহকদের যাতে খালি হাতে ফিরতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যদিও নির্ধারিত সময়ে এই ব্যাংকের চুয়াত্তর হাজার আমানতকারী মোট তিন হাজার নয়শ পঁচিশ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছিলেন, তাই সামনের দিনগুলোতেও এই অর্থ ছাড়ের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে। এর আগে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সব শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে পুরো মালিকানা নিজেদের হাতে নেয় সরকার।
এ বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, যাঁরা যথাযথভাবে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের সবার টাকা ফেরতের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করা হয়েছে। তবে আবেদনকারী সব গ্রাহক প্রথম দিনেই টাকা নিতে ব্যাংকে আসেননি। বরং যোগাযোগ করার পর অনেকে আমানত হিসেবে টাকা জমা রাখারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি কিছু গ্রাহক টাকা তুলে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তা ব্যাংকে জমা করেছেন বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, বনানী ও মতিঝিল এলাকার একাধিক শাখা ঘুরে দেখা যায়, প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো অর্থ এবং শাখার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংগৃহীত অর্থ দিয়ে পর্যাপ্ত নগদের সংস্থান রাখা হয়েছিল। সকাল থেকেই টাকা তুলতে আসা গ্রাহকদের ভিড় দেখা যায় এসব শাখায়। উপস্থিত গ্রাহকদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান শাখার কর্মকর্তারা, যা দীর্ঘদিনের অনাস্থার পর একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ইউনিয়ন ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক জানান, প্রথম দিনে আটজন গ্রাহক টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছিলেন, যাদের মধ্যে চারজন সরাসরি টাকা তুলে নিয়েছেন। বাকিদের সঙ্গে ব্যাংকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহকের হিসাবে মুনাফা জমা আছে, তাঁরাও চাইলে তা তুলে নিতে পারছেন বলে জানান তিনি।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক সংকটে থাকা এই পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ছিল চট্টগ্রামকেন্দ্রিক এক বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে, আর এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল অপর এক শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের হাতে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত এই দুই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন নিরীক্ষায় উঠে আসে।
দেশি-বিদেশি আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের প্রায় আশি শতাংশ ঋণই বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ বা লোপাট করা হয়েছিল। এর ফলে সৃষ্ট চরম আর্থিক সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। পরিস্থিতি সামাল দিতেই তৎকালীন সরকার ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার পথে হাঁটে এবং পুরনো মালিকানা বাতিল করে পুরো নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারও এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমানত ফেরত দেওয়ার এই প্রক্রিয়া সফলভাবে চালিয়ে যেতে পারলে তা কেবল সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারেই সহায়ক হবে না, বরং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

