বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে নতুন কঠোরতা আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম দিয়ে ঋণের অর্থের ব্যবহার যাচাই করাতে হবে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নীতিমালাটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য অতিরিক্ত দেখানো ও জাল দলিলপ্রমাণ ঠেকাতে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে কঠোর নজরদারি চালু করা হবে। এখন সেই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ জুন শেষে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। এই সংকটের মূলে রয়েছে ঋণের অর্থের অপব্যবহার, ব্যবসার জন্য নেওয়া ঋণ দিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বা বিদেশে পাচারের মতো ঘটনা।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় ঋণের অঙ্ক অনুযায়ী তিন স্তরের যাচাই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ১০০ কোটি টাকার কম ঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে অর্থ ব্যবহারের বিবরণী দিতে হবে এবং তারপর ব্যাংক নিজেই ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই করবে। ১০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ যাচাই করবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তবে যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ইউনিট থেকে নেওয়া যাবে না, স্বার্থের সংঘাত এড়াতেই এই বিধান। আর ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম দিয়ে যাচাই করাতে হবে। যে অডিট ফার্ম এই নিরীক্ষা করবে, তাকে একই ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কাজে নিয়োজিত করা যাবে না।
শুধু ঋণের পরিমাণেই নয়, মেয়াদি ও প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আসছে। যেকোনো অঙ্কের মেয়াদি বা প্রকল্প ঋণ কিস্তিতে বিতরণের ক্ষেত্রে আগের কিস্তির অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা পরবর্তী কিস্তি ছাড়ার আগে যাচাই করতে হবে। আর মোট ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি মেয়াদি বা প্রকল্প ঋণ বিতরণ শেষে তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম দিয়ে সামগ্রিকভাবে ঋণের অর্থের ব্যবহার যাচাই করতে হবে। নিরীক্ষার আওতায় থাকবে, অনুমোদিত প্রকল্পে অর্থ ব্যবহার হয়েছে কি না, অন্য খাতে সরানো হয়েছে কি না, ঋণের অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ শোধ বা শেয়ারবাজার, স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কী, এবং আমদানি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এলসি, বিল অভ এন্ট্রি ও কাস্টমসের নথিপত্র যথাযথ কি না।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের অপব্যবহারই খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে ঋণ বের করে নেওয়া, বেনামি ও ভুয়া ঋণ দেওয়া এবং ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করে ঋণগ্রহীতাদের দেশ ছেড়ে পালানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব জালিয়াতি হয়েছে। আবার অডিট ফার্মগুলোও যথাযথ প্রশ্ন না তুলেই ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় ঋণের অর্থের প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে আলাদা ও কার্যকর নিরীক্ষা চালু হলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল হক এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঋণ বিতরণের পর অর্থ কোন খাতে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা, দুই পক্ষেরই জবাবদিহি বাড়বে।’ তাঁর মতে, ‘এতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ে তা দিয়ে জমি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা বিদেশে পাচারের মতো অননুমোদিত কাজে ব্যবহারের প্রবণতা কমানো যেতে পারে।’ এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান বলেছেন, ‘অনেক বড় ঋণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে কাগুজে নথির ওপর ভিত্তি করে ঋণ বিতরণ, প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো এবং তহবিলের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কারণে। তাই ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আরও কঠোরভাবে যাচাই করার উদ্যোগটি সময়োপযোগী।’
অন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে, ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়ায় বড় ঋণের ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মের ইউটিলাইজেশন রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নেও ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর গ্রাহকের আর্থিক বিবরণী ও বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত নীতিমালা সেই আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে সফলতা নির্ভর করছে কঠোর প্রয়োগের ওপর। দেশে খেলাপি ঋণ জুন শেষে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের একাই প্রায় ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে ঋণের অর্থের ব্যবহার কঠোরভাবে যাচাই করা গেলে নতুন খেলাপি ঋণ তৈরির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত নীতিমালাটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায় কত দ্রুত এবং মাঠপর্যায়ে তা কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়।

