পটুয়াখালীতে অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রকল্পের প্রধান ঋণদাতা চীনা ব্যাংক। চলতি মাসের মধ্যেই প্রায় সাড়ে তেরো কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ—যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি—মূলধন ও সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ব্যাংকটি।
সময়মতো এই অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা, বকেয়া বিল আদায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
পটুয়াখালীর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হয়েছে দেশীয় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং চীনের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারত্বে। প্রকল্পের মোট বিনিয়োগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই দুই প্রতিষ্ঠান সমান অংশে ইকুইটি হিসেবে জোগান দিয়েছে, বাকি বড় অংশের অর্থায়ন এসেছে চীনের দুটি বড় ব্যাংকের যৌথ সিন্ডিকেট ঋণের মাধ্যমে, যার পরিমাণ প্রায় পৌনে দুইশ কোটি ডলারের কাছাকাছি। সমান উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা তেরোশ বিশ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগস্ট মাসের শেষদিকে প্রকল্প পরিচালনাকারী যৌথ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় ঋণদাতা ব্যাংক। চিঠিতে কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধের অর্থ প্রস্তুত রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির প্রত্যাশা, উৎপাদন থেকে আসা আয় দিয়েই মূলত এই ঋণের কিস্তি শোধ করা সম্ভব হবে।
ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখতে স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। এ জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কোনো কারণে ব্যাহত হলে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। এ কারণেই বর্তমান উৎপাদনের হার এবং তার বিপরীতে বিলের প্রকৃত পরিমাণ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জানানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জমে থাকা বকেয়া দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদও দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট একটি এজেন্ট ব্যাংকের হিসাবে জমা রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান, যাতে কিস্তি পরিশোধের অর্থপ্রবাহ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয় হয় স্থানীয় মুদ্রায়, অথচ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয় মার্কিন ডলারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছে ঋণদাতা ব্যাংক। মুদ্রা রূপান্তর ও তা বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন না হলে সামগ্রিক পরিশোধ প্রক্রিয়াতেই জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে চিঠিতে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতাধীন ঋণ খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সরাসরি সতর্ক করেছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, এর প্রভাব সরকারের গ্যারান্টিতে নেওয়া অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে, যাকে আর্থিক পরিভাষায় বলা হয় ক্রস ডিফল্ট। অর্থাৎ একটি প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা শুধু সেই প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য বৈদেশিক ঋণ বাধ্যবাধকতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, জ্বালানি খাতের বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সময়মতো রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, পটুয়াখালী কেন্দ্রকে ঘিরে সাম্প্রতিক এই ঘটনা তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। আগামী দিনগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো কীভাবে এই আর্থিক চাপ সামাল দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের স্থিতিশীলতা এবং দেশের সার্বভৌম গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক সুনাম।

