রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি ও বাড়তে থাকা ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এতে ব্যাংক থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায়। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক এই তথ্য প্রকাশ করেছে। এই ঋণ বৃদ্ধি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, রাজস্ব আদায় যেভাবে বাড়ছে, সরকারের চলতি ব্যয় সেই তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে, আর সেই ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পথেই হাঁটতে হচ্ছে সরকারকে।
বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি মেটানোর প্রধান দুটি উৎস, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ এবং সঞ্চয়পত্রের মতো অ-ব্যাংকিং উৎস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বাড়ছে। এর পেছনে বড় কারণ রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। একই সঙ্গে জ্বালানি ভর্তুকি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বাড়তি সহায়তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান মেটাতে ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে রাজস্ব দিয়ে ব্যয় মেটানো সম্ভব না হওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়াই একমাত্র সহজ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। আগস্টে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই ধারা যদি চলতে থাকে, তাহলে বাজেটে ব্যাংকঋণের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্থবছর শেষ হওয়ার অনেক আগেই ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল।
সরকারের এই ব্যাংকঋণ নির্ভরতা সাধারণ অর্থনীতির ওপর কয়েকটি স্তরে প্রভাব ফেলে। প্রথমত, ব্যাংকগুলো যখন সরকারকে ঋণ দেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। একে বলা হয় ক্রাউডিং-আউট এফেক্ট, সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি ব্যবসা-বিনিয়োগ কমে যায়। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশ কম, কিন্তু ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়লে এবং সরকারের এই ঋণ নেওয়ার ধারা একই থাকে, তাহলে বেসরকারি খাত সুদের হার বাড়বে এবং ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রেজ বলেছেন, বাজেট ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র রাজস্ব আদায়ের ধারার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা জরুরি, নইলে এই ফান্ডিং মিসম্যাচ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণের মধ্যে বড় অংশই আসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ হিসেবে। একে বলা হয় ‘সিকিউরিটিজ ক্রয়’ সরকার যখন ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। জুন মাস শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ ছিল ৯৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা, যা পরবর্তী মাসগুলোতে বেড়ে চলেছে। এই ঋণ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে মুদ্রা সরবরাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমানো জরুরি, বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
আগামী মাসগুলোতে সরকারের ব্যাংকঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে বেতন-ভাতা খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকিও বাড়তে পারে। এসব ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু কর আহরণে বড় ধরনের সংস্কার না হলে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। ফলে হয় ব্যয় কমানো, নয়তো আরও ঋণ নেওয়া, এই দুইয়ের একটি বেছে নিতে হবে সরকারকে। আর এই সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে, দেশের অর্থনীতি আগামী দিনে স্বস্তিতে থাকবে, নাকি আরও ঋণের বোঝা বইতে হবে।

