বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ, নমনীয় ও সাশ্রয়ী করতে বড় ধরনের নীতি শিথিলতা আনল বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোকে (ওবিইউ) এখন থেকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় এবং ক্রস-কারেন্সি সোয়াপ লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ (এফইপিডি) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। নতুন এই নির্দেশনার ফলে ওবিইউগুলো নিজেদের মধ্যে এবং অনুমোদিত ডিলার (এডি) ও দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিটের (ডিবিইউ) সঙ্গে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন করতে পারবে। এর ফলে অনুমোদিত বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ওবিইউগুলো এখন তাদের নিজস্ব ডিবিইউ, অন্যান্য অনুমোদিত ডিলার, অন্যান্য ওবিইউ এবং বৈধ স্থানীয় পক্ষের সঙ্গে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা করতে পারবে। এর ফলে তারা উপযুক্ত উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল সংগ্রহ, তহবিলের কাঠামো আরও কার্যকরভাবে সাজানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে পারবে। পাশাপাশি ক্রস-কারেন্সি সোয়াপ লেনদেনের সুযোগও মিলছে। এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে দুই পক্ষ দুই মুদ্রার সুদ ও মূল পরিশোধ পরস্পরের মধ্যে বিনিময় করে, যা একাধিক মুদ্রার মধ্যে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়। ব্যাংকিং খাতের ভাষায়, এর ফলে ওবিইউগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রেজারি কার্যক্রমের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করতে পারবে। ওবিইউর বিদ্যমান নির্দেশনা ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি জারি করা হয়েছিল, যেখানে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন সার্কুলারে সেই বিধানের কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই সুবিধা দিলেও একগুচ্ছ কঠোর শর্তও আরোপ করেছে। সার্কুলারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই লেনদেনগুলো অবশ্যই অনুমোদিত গ্রাহক লেনদেন, তহবিলের প্রয়োজন, নিষ্পত্তির দায়, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ব্যবস্থাপনা, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা অথবা বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে হবে। অর্থাৎ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার দামের ওঠানামা থেকে মুনাফা করার উদ্দেশ্যে জল্পনামূলক লেনদেন করা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অনুমাননির্ভর বা স্পেকুলেটিভ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের উদ্দেশ্যে ওবিইউগুলো এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। লেনদেন পরিচালনার সময় ওবিইউগুলোকে প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত বিধিবিধান, প্রুডেনশিয়াল বা সতর্কতামূলক নির্দেশনা, অনুমোদিত অভ্যন্তরীণ নীতিমালা, ডিলিং ও কাউন্টারপার্টি সীমা এবং যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রেজারি চর্চার সঙ্গে দেশের অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর জন্য সাশ্রয়ী বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে ওবিইউগুলো কম খরচে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে তা দিয়ে অনুমোদিত বাণিজ্য অর্থায়ন করতে পারবে। এতে একদিকে যেমন রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যে অর্থায়নের খরচ কমবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশে ১৯৮৫ সাল থেকে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু আছে, মূলত রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন সহজ করতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশের প্রায় সব তফসিলি ব্যাংকেরই একটি করে ওবিইউ রয়েছে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ওবিইউর পরিধি বাড়াতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসীদের জন্য ‘নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট’ চালু, ওবিইউতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা আমানতের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রায় ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিকারকদের জন্য ডলার-টাকা সোয়াপ সুবিধা সম্প্রসারণ। নতুন এই সার্কুলার সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা এখন খুব দ্রুত ঘটে, বিশেষ করে যখন ডলারের বিপরীতে টাকার মান চাপে থাকে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে মুদ্রা বিনিময়ের সুযোগ না থাকলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা তারল্য ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা বাড়বে, কমবে তারল্য সংকটের আশঙ্কা। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক খরচে এলসি খুলতে পারবেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সহজ হবে। তবে জল্পনা ও মুনাফার সুযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর অবস্থান এবং তদারকি ব্যবস্থাই বড় প্রমাণ হবে যে এই সুবিধা প্রকৃত বাণিজ্যে সহায়ক হবে, নাকি নতুন বিনিয়োগ ফাঁদ তৈরি হবে।

