বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করা অন্যতম আন্তর্জাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের সাধারণ গ্রাহকদের জন্য পরিচালিত ব্যাংকিং সেবা বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকটির এই সিদ্ধান্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, তারা দেশে তাদের করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ বড় প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য দেওয়া সেবায় তারা আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমানে ব্যাংকটির যেসব গ্রাহক সঞ্চয়ী হিসাব, কার্ড, ঋণসহ বিভিন্ন সেবা ব্যবহার করছেন, তাদের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে এবং দেশের ব্যাংকিং বাজারে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে।
এর আগে আরেক আন্তর্জাতিক ব্যাংক এইচএসবিসিও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এইচএসবিসি ঘোষণা দেয়, তারা বাংলাদেশে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য দেওয়া ব্যাংকিং সেবা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনবে। তবে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
সাধারণ গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা কী?
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংক যে সেবাগুলো দেয়, সেগুলোই সাধারণ গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা। এর মধ্যে রয়েছে সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ, আমানত, এটিএম সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন ব্যাংকিং।
সহজভাবে বলতে গেলে, একজন সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সঙ্গে যে ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেন, তার সবচেয়ে বড় অংশই এই সেবার মাধ্যমে হয়।
তাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যবসায়িক পরিবর্তন নয়, বরং দেশের সাধারণ ব্যাংক গ্রাহকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৫ সালের শেষে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি উদ্যোক্তা ঋণ পোর্টফোলিওর পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড?
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানিয়েছে, তাদের এই সিদ্ধান্ত একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। বর্তমানে ব্যাংকটি আন্তর্জাতিক লেনদেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বড় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।
বড় কোম্পানি, সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দেওয়া সেবাগুলোতে ব্যাংকটি নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে চায়।
এই ধরনের সেবার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন, বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় এবং বড় বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্তকে শুধু বাংলাদেশের বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত ব্যাংকটির বৈশ্বিক ব্যবসার পুনর্বিন্যাসের অংশ।
তবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কোনো দেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সেই দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ কী হারাতে পারে?
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট মানের ব্যাংকিং সেবা দিয়ে এসেছে। তাদের উপস্থিতি স্থানীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি প্রতিযোগিতামূলক মান তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সাধারণত উন্নত প্রযুক্তি, নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য, কঠোর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং উন্নত গ্রাহকসেবার মাধ্যমে বাজারে প্রভাব তৈরি করে।
তাই তাদের সাধারণ গ্রাহকের সেবা থেকে সরে যাওয়ার ফলে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতে গ্রাহকরা আগের মতো একই ধরনের সুবিধা পাবেন কি না।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের অর্থ গ্রাহকরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এমন নয়। বরং স্থানীয় ব্যাংকগুলো যদি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তি, সেবার মান এবং নতুন পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
এর ফলে সাধারণ গ্রাহকরাও উন্নত সেবা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের পরিবর্তন নতুন নয়
বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিবর্তন বা বিক্রির ঘটনা আগেও ঘটেছে।
এর মধ্যে অন্যতম উদাহরণ হলো ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল বা বিসিসিআই। ব্যাংকটি বাংলাদেশে তিনটি শাখার মাধ্যমে সাধারণ ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা দিত।
১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাপী বিসিসিআই বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে এর কার্যক্রম ১৯৯২ সালে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর সঙ্গে ব্যাংকটির সম্পদ, দায় এবং কর্মীদের একটি অংশও নতুন প্রতিষ্ঠানের আওতায় আসে।
এর আগে ফ্রান্সের ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ইন্ডোসুয়েজও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে সরে যায়। পরে তাদের স্থানীয় কার্যক্রম শ্রীলঙ্কার কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের কাছে বিক্রি করা হয়।
এ ছাড়া গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের কার্যক্রমও পরবর্তীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন সুযোগ
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসির সাধারণ গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো যেখানে বড় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, সেখানে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সামনে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য উন্নত সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে শুধু গ্রাহক গ্রহণ করলেই হবে না, বরং প্রযুক্তি উন্নয়ন, নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থা এবং ভালো গ্রাহকসেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং বাজারে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিদেশি ব্যাংকের উপস্থিতি কমলেও, এর মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য আরও উন্নত সেবা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

