দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯৩ শতাংশ বেশি।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সোনালী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৪১ টাকা ৪৭ পয়সা, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ১৪ টাকা ১৪ পয়সা।
এই মুনাফার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে এসেছে।
ব্যাংক খাতের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সোনালী ব্যাংকের মুনাফা অনেক বড় বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায়ও বেশি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, একই সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে পাওয়া আয় এবং ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের পরিমাণ কমে যাওয়া।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমে ৪২৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় নেমেছে।
উচ্চ ঋণ ব্যয়ের কারণে সুদভিত্তিক আয় কমেছে বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এই ঘাটতি পূরণ করেছে ব্যাংকের বিনিয়োগ আয়। ট্রেজারি কার্যক্রম থেকে সোনালী ব্যাংক প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা আয় করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি।
সরকারি সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।যদিও ট্রেজারি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার কারণে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় কিছুটা চাপ দেখা গেছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সোনালী ব্যাংকের কর ও প্রভিশনের আগের সমন্বিত পরিচালন মুনাফা ৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।তবে শেষ পর্যন্ত নিট মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি এসেছে মূলত ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন কমে যাওয়ার কারণে।
ব্যাংকের নিট মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনের পরিমাণ কমে যাওয়া।২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সোনালী ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা প্রভিশন রেখেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ ৫৯ শতাংশ কম।
প্রভিশন কমানোর ফলে ব্যাংকের আয় থেকে কম অর্থ আলাদা রাখতে হয়েছে, যা সরাসরি নিট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।তবে ব্যাংকের ঋণ পরিস্থিতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ শেষে সোনালী ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ।২০২৫ সালের শেষে এই হার ছিল ১৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়েছে।
২০২৬ সালের জুন শেষে সোনালী ব্যাংকের সমন্বিত নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি প্রতি শেয়ারে দাঁড়িয়েছে ৩৩২ টাকা ৩ পয়সা।
ব্যাংকটির মুনাফার এই প্রবৃদ্ধি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু বিনিয়োগ আয় বা প্রভিশন কমানোর ওপর নির্ভর না করে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম, বিশেষ করে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আরও উন্নতি করতে হবে।
সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ফলাফল দেখাচ্ছে, বিনিয়োগ আয় এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে মুনাফা বাড়ানো সম্ভব হলেও একটি ব্যাংকের টেকসই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত ব্যাংকিং কার্যক্রম।

