বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন একটি পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে। প্রচলিত ব্যাংকের মতো কোনো শাখা বা নিজস্ব এটিএম ছাড়াই শুধুমাত্র মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা হলো ডিজিটাল ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২৫ সেপ্টেম্বর আরও চারটি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ জুন প্রথমবার ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য নীতিমালা জারি করা হয়েছিল। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়।
ডিজিটাল ব্যাংকের মূল ধারণা হলো, গ্রাহককে ব্যাংকের শাখায় না গিয়েই প্রায় সব ধরনের সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া।
ডিজিটাল ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য গ্রাহককে কোনো শাখায় যেতে হবে না। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই হিসাব খোলা যাবে। পরিচয় যাচাই বা গ্রাহক তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে।
হিসাব খোলার পর গ্রাহক মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে নিজের হিসাবের ব্যালান্স দেখতে পারবেন, টাকা স্থানান্তর করতে পারবেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে পারবেন এবং সঞ্চয়সহ অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
ডিজিটাল ব্যাংক গ্রাহকদের ভার্চুয়াল কার্ড এবং কিউআর কোডভিত্তিক অর্থ পরিশোধের সুবিধা দিতে পারবে। তবে তারা প্রচলিত ব্যাংকের মতো কোনো ধরনের শারীরিক কার্ড ইস্যু করতে পারবে না।
ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব কোনো শাখা বা এটিএম থাকবে না। তাই নগদ টাকা তুলতে হলে গ্রাহকদের অন্য ব্যাংকের এটিএম নেটওয়ার্ক, অনুমোদিত ক্যাশ আউট ব্যবস্থা বা অন্যান্য নির্ধারিত সুবিধা ব্যবহার করতে হবে।
ঋণের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। গ্রাহক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণের আবেদন করতে পারবেন। লেনদেনের ইতিহাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাহকের ঋণ সক্ষমতা যাচাই করা হতে পারে।
এর ফলে যেসব মানুষ প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহজে ঋণ পান না, বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী বা যাদের বড় ধরনের জামানত নেই, তারাও ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সহজলভ্যতা। গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না বা নির্দিষ্ট অফিস সময়ের অপেক্ষা করতে হবে না। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা নেওয়া সম্ভব হবে।
এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশেষ করে তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে, যারা দূরবর্তী এলাকায় থাকেন অথবা কাছাকাছি কোনো ব্যাংক শাখা নেই। পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী ও ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত মানুষদের জন্য এটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় কম হতে পারে। কারণ তাদের শাখা পরিচালনা, বড় অবকাঠামো এবং নিজস্ব এটিএম ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। এর ফলে ভবিষ্যতে কিছু সেবা কম খরচে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংককে প্রচলিত ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে সরাসরি দেখা যাবে না। তাদের কার্যক্রমের ওপর কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকবে।
ডিজিটাল ব্যাংক ঋণপত্র বা বড় ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ সুবিধা দিতে পারবে না। তাদের ঋণ কার্যক্রম মূলত ব্যক্তি গ্রাহক ও ছোট ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এ ছাড়া গ্রাহকরা ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে সরাসরি শাখায় গিয়ে সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। কোনো সমস্যা হলে মুখোমুখি ব্যাংকিং সহায়তার পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হবে।
নিজস্ব এটিএম না থাকায় নগদ টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও অন্য প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তির নিরাপত্তা, গ্রাহকের আস্থা এবং সেবার মানের ওপর। ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়বে, ততই তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের যাত্রা মূলত ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি উদ্যোগ। তবে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে হলে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করাই হবে এই নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

