দেশের ব্যাংক খাতে জমে থাকা বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশই আটকে আছে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে, যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ আটচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে একটি ব্যাংকে, যেখানে এই অঙ্ক পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকার বেশি, আরেকটিতে ঊনত্রিশ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ব্যাংকগুলোতেও এই পরিমাণ যথাক্রমে আট থেকে ঊনিশ হাজার কোটি টাকার মধ্যে।
এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যে নগদ আদায় বাড়ানো, ঋণের গুণগত মান খতিয়ে দেখা, আমানত বৃদ্ধি এবং মূলধন পরিস্থিতির উন্নতির নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়, যেখানে শীর্ষ বিশজন ঋণখেলাপির তালিকা তৈরি এবং এক থেকে দুই বছরের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
তবে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, জামানত আদায় এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার সত্যিকার অর্থে কঠোর অবস্থানে যাবে কি না—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
এ বিষয়ে ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, সমস্যার মূলে রয়েছে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি। তার মতে, সরকারের যথার্থ সদিচ্ছা থাকলে এই ব্যাংকগুলোকে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই লাভজনক ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে সেই সদিচ্ছার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কয়েকটি ব্যাংকে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে বড় ধরনের প্রভিশন সংকট ও মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনে এসব ব্যাংককে মূলধন সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার, তবে শর্ত হিসেবে ঋণ আদায় বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করে লাভজনক অবস্থায় ফিরে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ওই বিশেষজ্ঞ আরও ব্যাখ্যা করেন, নগদ আদায় বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ, কারণ তা সম্ভব হলে অনেক আগেই তা করা হতো। তার মতে, ঋণ আদায়ের সবচেয়ে ভালো উপায় নগদ আদায়, কিন্তু জামানত বা সম্পদ বিক্রি করে আদায়ের চেষ্টা করলে তা একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে জটিল হয়ে পড়ে, কারণ ঋণখেলাপিরাও আইনি প্রতিরক্ষায় সমান দক্ষ এবং তারাও প্রতিপক্ষে মামলা ঠুকে দিতে পারেন, যার ফলে পুরো আদায় প্রক্রিয়াই দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় আটকে যেতে পারে।
সরকারি ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, এবং একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো ও নতুন নতুন গ্রাহকসেবা চালুর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নির্দেশনা বা কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এত বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা কঠিন, যদি না বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়।

