দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ আবারও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অঙ্কের হিসাবে এটি ৩ হাজার ৬১৪ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১২৯ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ৩১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
এর আগে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জুলাই ও আগস্ট মাসের আমদানি বিল বাবদ ১৩৯ কোটি ২২ লাখ ৭ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়। ওই পরিশোধের আগে আগস্ট শেষে দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বিল মেটানোর পর তা সাময়িকভাবে কমে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে। পরে রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করে এবং এখন ৩৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আকু হলো আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক লেনদেন ও আমদানি বিল নিষ্পত্তির একটি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানি লেনদেন সহজ হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমে। সাধারণত প্রতি দুই মাস পরপর আকুর বিল পরিশোধ করা হয়। বর্তমানে এর সদস্য নয়টি দেশ। এগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার ও ইরান। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত।
রিজার্ভের এই তথ্য দুই ধরনের হিসাবে প্রকাশ করা হয়। গ্রস রিজার্ভে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা সব বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ ধরা হয়। আর আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে কেবল সেই অর্থই গণনায় আসে, যা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। এ কারণে দুই হিসাবের মধ্যে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রিজার্ভের প্রকৃত সক্ষমতা মাপতে বিপিএম৬ হিসাবকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আকুর বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে যাওয়া নতুন কিছু নয়। প্রতি দুই মাসে এমন পরিশোধ হয় বলে রিজার্ভে সাময়িক ওঠানামা স্বাভাবিক। তবে এবার উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৩৯ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পরও রিজার্ভ দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে একধরনের স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে আগস্ট শেষের ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বর্তমান রিজার্ভ এখনো প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি কম। অর্থাৎ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। রিজার্ভ বাড়ার প্রবণতা টেকসই কি না, তা নির্ভর করবে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও আমদানি ব্যয়ের গতিপ্রকৃতির ওপর।
অর্থনীতির জন্য রিজার্ভ এমন একটি রক্ষাকবচ, যা আমদানি ব্যয় মেটানো, বিদেশি ঋণ পরিশোধ এবং ডলারের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা রাখতে সহায়তা করে। রিজার্ভ শক্ত থাকলে বাজারে আস্থা বাড়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি নিয়ে চাপের সময়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে কিছুটা সক্ষমতা থাকে।
আগামীকাল ঘোষিতব্য ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতির প্রেক্ষাপটেও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। রিজার্ভ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলে বিনিময় হার ও সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে কিছুটা বাড়তি জায়গা থাকে। তবে বিপিএম৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা এখনো সতর্কভাবে দেখার মতো পর্যায়। তাই রিজার্ভ বাড়লেও এর ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা ও রেমিট্যান্স-রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে এ স্বস্তিকে স্থায়ী রূপ দিতে নিয়মিত ডলার আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।

