মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি এবং সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন বিবেচনায় নীতিসুদ অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল নীতিসুদ ৯ দশমিক ৫ শতাংশে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এই প্রবণতা স্থায়ী কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
এর আগে ২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ আধা শতাংশ কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল। এবার নতুন কোনো পরিবর্তন না এনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে।
এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতি। এর আগে সাধারণত ছয় মাসের জন্য একসঙ্গে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান জানান, আগস্টে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার কারণে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি কমার সাম্প্রতিক ধারা এখনো দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা দেয় না। তাই নীতিসুদ কমানোর আগে পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণ করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং দেশের জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মুদ্রানীতি কমিটি আরও এক থেকে দুই মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বর্তমান নীতিসুদ এখনো তুলনামূলক কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদের হার এখনো বেশি এবং অন্যান্য দেশের তুলনায়ও এটি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে এখনো দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই সংখ্যা অর্থনীতির প্রকৃত চাপ পুরোপুরি তুলে ধরে না।
গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে শিল্প উৎপাদনও ০ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। তবে চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থ থেকে দেওয়া হবে।
এই অর্থের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চালু, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং রপ্তানি খাতে সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং উৎপাদন কার্যক্রমে গতি আসতে পারে।
তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যেখানে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও ঋণের চাহিদা কম থাকায় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি আসছে না। আন্তঃব্যাংক সুদের হার ও সরকারি বন্ডের মুনাফা কমলেও সেই সুবিধা এখনো পুরোপুরি ঋণগ্রহীতাদের কাছে পৌঁছায়নি।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।
ডেপুটি গভর্নর স্বীকার করেছেন, খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় আগের পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট দ্রুত ছিল না। এখন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশ ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত পেয়েছে, যার বড় কারণ ছিল প্রবাসী আয় বৃদ্ধি।
এই উদ্বৃত্তের কারণে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা হয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি কিনেছে।
তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক লেনদেন আবার ঘাটতিতে গেছে। যদিও এ সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ধীরে ধীরে হবে। ভবিষ্যতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা, আর্থিক খাত সংস্কার এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

