২০১৩ সালের ২০ মার্চ প্রতিষ্ঠিত মেঘনা ব্যাংক একই বছরের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। প্রযুক্তি, পেশাদারত্ব ও সেবার সমন্বয়ে গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করাই ছিল লক্ষ্য। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক যুগের পথচলায় ডিজিটাল ব্যাংকিং, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সবুজ অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এসব তথ্য মূলত ব্যাংকটির নিজস্ব দেওয়া, স্বাধীন কোনো মূল্যায়ন এতে নেই। সূচকগুলোর মধ্যে আমানত ও ঋণে প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট হলেও খেলাপি ঋণের হার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আর্থিক সূচকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির দাবি করেছে ব্যাংকটি। ২০২১ সালে মোট আমানত ছিল ৫ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে আমানত দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। আমানতের তুলনায় ঋণ কম হওয়ায় ব্যাংকের হাতে তারল্য রয়েছে বলে ধারণা করা যায়, তবে প্রতিবেদনে তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির সম্পদ ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণের চিত্রটি তুলনামূলক ভিন্ন। ২০২১ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। ব্যাংক এটিকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায় বলছে। বাস্তবে হার সামান্য বেড়েছে। ঋণ ও আমানতের এত প্রবৃদ্ধির মধ্যেও খেলাপির হার কমাতে না পারা ঋণের মান ও আদায় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এ হার ব্যাংক খাতের গড়ের তুলনায় কেমন, সে তথ্য প্রতিবেদনে নেই। রেমিট্যান্সে অগ্রগতি স্পষ্ট। ২০২১ সালের ৩ কোটি ৩৪ লাখ ডলার থেকে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় তিন গুণ।
সেবার পরিধিতে ব্যাংকটির ৫৪টি শাখা ও ২০টি উপশাখা রয়েছে। প্রান্তিক মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ১৮টি জেলায় ৩৩টি এজেন্ট আউটলেট চালু আছে, যেখানে ১০ থেকে ১০০ টাকায় ‘জীবিকা অ্যাকাউন্ট’ খোলা যায়। নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্ক না গড়ে ব্যাংকটি গ্রাহককেন্দ্রিক পদ্ধতি নিয়েছে, ফলে ডেবিট কার্ডধারীরা সারা দেশের ২০ হাজারের বেশি এটিএম থেকে বিনা মূল্যে টাকা তুলতে পারেন। এটি ব্যয় সাশ্রয়ী কৌশল হলেও অন্যের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা তৈরি করে। ব্যাংকের মোট গ্রাহক ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫৬ জন এবং ইস্যুকৃত কার্ড ১ লাখ ৩ হাজার ৪৩৬টি, যার ৬৫ শতাংশ পুরুষ ও ৩৫ শতাংশ নারী গ্রাহকের। আমানত বিবেচনায় গ্রাহকসংখ্যা তুলনামূলক কম, অর্থাৎ গ্রাহকপ্রতি গড় আমানত বড়, যা সম্ভবত করপোরেট ও বড় আমানতকারীর ওপর নির্ভরতার ইঙ্গিত। নারী গ্রাহকের অংশ এখনো এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কমানোর সুযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরে ২০২০ সালে ‘মেঘনা ব্যাংক আই-ব্যাংকিং’ এবং ২০২৪ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা ‘মেঘনা পে’ চালু হয়েছে। ২০২৫ সালে শতভাগ পুনর্ব্যবহৃত উপাদানে তৈরি ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড আনা হয়েছে। বিদেশে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পাঠানোর জন্য ‘মেঘনা আরোহী’ সেবায় ৫০টির বেশি দেশে অর্থ পাঠানো যায়। শিশু-কিশোর ও তরুণদের সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে রয়েছে ‘ইয়াংস্টার’ ও ‘ইয়াংস্টার প্লাস’ অ্যাকাউন্ট। তবে এসব সেবা কতজন গ্রাহক ব্যবহার করছেন, প্রতিবেদনে সেই তথ্য নেই। ফলে সেবাগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা কঠিন।
এসএমই খাতে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঋণ পোর্টফোলিও ২১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা হয়েছে। সহজ শর্তে ৬৪৩ নারী উদ্যোক্তাকে ১৫১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসএমই ঋণ মোট ঋণের প্রায় ১৯ শতাংশ, যা কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কর্পোরেট খাতের জন্য ব্যাংকটি প্রথাগত ঋণের বাইরে ‘সাপ্লাই চেইন ফিন্যান্স’ বা ফ্যাক্টরিং সেবাও শুরু করেছে।
সবুজ অর্থায়নে ২০২৬ সালের জুন শেষে ঋণস্থিতি ৭৪৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮৭ শতাংশ বেশি। এটি মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশ। ব্যাংকে বর্তমানে ১ হাজার ২৯৪ কর্মী কাজ করছেন এবং ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ২৭২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ভ্যাট, কর ও শুল্ক হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে আমানত, ঋণ, রেমিট্যান্স ও সবুজ অর্থায়নে মেঘনা ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান। তবে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ধরে রাখা এবং মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকের তথ্য না থাকায় ব্যাংকের সার্বিক স্বাস্থ্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। আগামী দিনে খেলাপি কমানো এবং ডিজিটাল ও এসএমই সেবার বিস্তারই ব্যাংকটির টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল পরীক্ষা হবে।

