ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পণ্য ও সেবার মূল্য নেওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে বাংলা কিউআরে লেনদেনের সময় বিক্রেতাকে আর এই মাশুল দিতে হবে না। একই সঙ্গে ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তি পর্যায়েও বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন চালু হচ্ছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, বাংলা কিউআরকে আরও সুশৃঙ্খল ও টেকসই করার লক্ষ্যেই ১ শতাংশ এমডিআর স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরিফ হোসেন খানের ভাষ্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সর্বস্তরের মানুষের জন্য একটি টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতি গড়তে নিরাপদ, সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তঃডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর চালু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন। গত জুনে একক বাংলা কিউআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর এই মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে। একই সময়ে লেনদেনের আর্থিক মূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। অর্থাৎ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের পর ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে।
ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগামী ১ নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক পার্সন-টু-পার্সন (পিটুপি) লেনদেন চালু হবে। এর ফলে ব্যক্তি পর্যায়েও এই কিউআর ব্যবহার করে আন্তঃলেনদেন আরও সহজ হবে বলে তিনি জানান।
এই সিদ্ধান্তের কয়েকটি দিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, এমডিআর স্থগিতের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন ছোট ব্যবসায়ীরা। মুদি দোকান, চায়ের স্টল, সবজি বিক্রেতা কিংবা ফুটপাতের দোকানির মতো স্বল্প মুনাফার ব্যবসায় প্রতিটি লেনদেনে ১ শতাংশ কেটে নেওয়া অনেক সময় বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই খরচ না থাকলে তাঁরা ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে বেশি আগ্রহী হবেন। ফলে নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের প্রশ্ন। এমডিআর সাধারণত পেমেন্ট ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ মেটাতে ব্যবহৃত হয়। এই আয় বন্ধ হলে নেটওয়ার্ক পরিচালনা, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের খরচ কীভাবে মেটানো হবে, সে প্রশ্ন সামনে আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্থগিত’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। ফলে ভবিষ্যতে ভিন্ন কাঠামোয় মাশুল ফেরার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, ব্যক্তি পর্যায়ে কিউআর চালুর প্রভাব। পিটুপি লেনদেন শুরু হলে সাধারণ মানুষ আলাদা অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্মের বাধা ছাড়াই একে অপরকে অর্থ পাঠাতে পারবেন। এতে আন্তঃপ্ল্যাটফর্ম লেনদেন সহজ হবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সেবার নিরাপত্তা, লেনদেনের গতি ও প্রতারণা ঠেকানোর সক্ষমতার ওপর।
চতুর্থত, নিরাপত্তা ও গ্রাহক সচেতনতা। কিউআর কোডের ব্যবহার বাড়লে ভুয়া কোড দিয়ে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই বিক্রেতা ও গ্রাহক, উভয় পক্ষকে সচেতন করা জরুরি। লেনদেনের আগে প্রাপকের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
পঞ্চমত, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। ৪০ লাখ মার্চেন্ট এখন এই ব্যবস্থার আওতায়। কিন্তু নেটওয়ার্ক সংযোগের সমস্যা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা এবং অর্থ জমা পেতে দেরির মতো সমস্যা সমাধান না হলে বিক্রেতাদের আস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। মাশুল ছাড় আকর্ষণীয় হলেও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে এমডিআর স্থগিত ও ব্যক্তি পর্যায়ে কিউআর চালুর সিদ্ধান্ত ডিজিটাল অর্থনীতির পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, খরচ কমার এই সুবিধা কতটা কার্যকরভাবে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায় এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আয় কমার চাপ সামলে কীভাবে মান ধরে রাখে।

