একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি এসে সময় ও দূরত্বের প্রচলিত ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং। দেড়-দুই দশক আগেও ব্যাংকিং মানেই ছিল নির্দিষ্ট সময়ে শাখায় যাওয়া, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, ফরম পূরণ, চেক বা পাসবই নিয়ে কর্মকর্তার টেবিলের সামনে অপেক্ষা করা। টাকা জমা দেওয়া, উত্তোলন, অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ কিংবা হিসাবের তথ্য জানতে গ্রাহককে ব্যাংকের শাখার ওপর নির্ভর করতে হতো।
প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকলেই ব্যাংকের বহু কাজ ঘরে বসে সম্পন্ন করা যায়। ফলে ব্যাংক আর শুধু একটি ভবন বা নির্দিষ্ট ঠিকানা নয়; ব্যাংকিং ক্রমেই হয়ে উঠছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা একটি সেবা।
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান। মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম, কার্ড, কিউআর কোড, আন্তঃব্যাংক অর্থ স্থানান্তর, অনলাইন বিল পরিশোধ ও ই-কমার্স লেনদেন এখন দৈনন্দিন অর্থনীতির অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পরিশোধ ব্যবস্থা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে বছর মোট লেনদেনের সংখ্যা ১০৮০ কোটিতে পৌঁছায়; ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ও মূল্য—দুটিই প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২৫ সালে দেশের ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বছরজুড়ে ডিজিটাল মাধ্যমে মোট ৫৪৬.৩ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১০২.২৪ লাখ কোটি টাকা।
অন্যদিকে নগদ ও চেকনির্ভর নন-ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যাও বেড়েছে। এ ধরনের লেনদেনের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৩৯.৫ কোটিতে পৌঁছায়। তবে লেনদেনের সংখ্যা বাড়লেও এ মাধ্যমে স্থানান্তরিত অর্থের মোট মূল্য ৭ শতাংশ কমে ২০৯.৪৮ লাখ কোটি টাকায় নেমে আসে।তবে নগদ লেনদেনও বেড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি নগদনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসেনি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং কী? সহজ ভাষায়, শাখায় সশরীরে উপস্থিত না হয়ে ইন্টারনেট, মোবাইল অ্যাপ, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ ও পরিচালনার ব্যবস্থাই ডিজিটাল ব্যাংকিং। এর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং, কিউআরভিত্তিক মূল্য পরিশোধ, অনলাইন অর্থ স্থানান্তর, ডিজিটাল বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল ব্যাংক এক বিষয় নয়। প্রচলিত কোনো ব্যাংক তার মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা দিলেও সেটি নিজে ‘ডিজিটাল ব্যাংক’ হয়ে যায় না। অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংক হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত পৃথক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, যার কার্যক্রম মূলত শাখাবিহীন ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। আধুনিক ব্যবস্থাকে তাই তিনটি স্তরে দেখা যায়—প্রচলিত ব্যাংকের অনলাইন ও মোবাইল সেবা, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য ডিজিটাল অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং পূর্ণাঙ্গ শাখাবিহীন ডিজিটাল ব্যাংক।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নির্দেশিকা চালু করে যেখানে প্রাথমিক মূলধন ১২৫ কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে তা সংশোধন করে মূলধনের শর্ত আরও কঠোর করে। বর্তমানে একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই মূলধনের প্রয়োজন ৫০০ কোটি টাকা। ডিজিটাল ব্যাংককে লাইসেন্স পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে যেতে হবে এবং সেই গণপ্রস্তাবের পরিমাণ স্পনসরদের প্রাথমিক মূলধনের চেয়ে কম হতে পারবে না।
ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—প্রচলিত ব্যাংকের মতো দেশজুড়ে শাখা থাকবে না; মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হবে। তবে শাখা না থাকলেও ব্যাংক হিসেবে এর ওপর প্রচলিত ব্যাংকের মতোই ব্যবসা, পরিচালনা, সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিধান প্রযোজ্য হবে।
২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই উদ্যোগ আরও বাস্তব পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে অভিপ্রায়পত্র দিয়েছে—ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি। তবে অভিপ্রায়পত্র চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করার পরই কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পেতে হবে। এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা। কারণ ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ এখন শুধু নতুন শাখা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রযুক্তি, তথ্য, দ্রুত সেবা ও আন্তঃসংযোগও প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠছে।
শাখা থেকে পর্দায়: বদলে গেছে নাগরিক জীবন। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতা কমে যাওয়া। একজন গ্রাহক বাড়িতে, কর্মস্থলে কিংবা ভ্রমণের সময় হিসাবের স্থিতি দেখতে পারেন, অর্থ স্থানান্তর করতে পারেন, বিভিন্ন বিল দিতে পারেন, কার্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন এবং অনলাইন কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ করতে পারেন।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে ‘সব সেবা সব সময়’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু থাকলেও নির্দিষ্ট লেনদেনের সীমা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার সময়সূচির কারণে কোনো কোনো সেবা সাময়িকভাবে সীমিত হতে পারে। বাস্তবতা হলো—ডিজিটাল ব্যবস্থা শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশের ১১ হাজার ৫০৩টি ব্যাংক শাখার সবগুলোতেই অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা চালু ছিল। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের মূল্য ১৩,৫২৯.১৮ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়। এটিএম, ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্য ছিল। অর্থাৎ ডিজিটাল রূপান্তর শুধু নতুন ডিজিটাল ব্যাংককে ঘিরে নয়; প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরেও তা গভীরভাবে প্রবেশ করেছে।
জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামো ও দ্রুত লেনদেন। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পেছনে কাজ করছে বিস্তৃত জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামো। জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট দেশের অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেনে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে ডিজিটাল মাধ্যমে মোট ৫৪৬.৩ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১০২.২৪ লাখ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় লেনদেনের সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
দেশের মোট লেনদেনের চিত্রেও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৫ সালে মোট ৩১১.৭২ লাখ কোটি টাকা লেনদেনের মধ্যে প্রায় ৩২.৮ শতাংশ ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে আরটিজিএস, এনপিএসবি, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর কোড ও মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে মোট লেনদেনের প্রায় ৬৭.২ শতাংশ এখনো নগদ ও অন্যান্য প্রচলিত মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ২০২৪ সালে প্রচলিত বা নগদনির্ভর লেনদেনের অংশ প্রায় ৭২ শতাংশ ছিল—অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডিজিটাল লেনদেনের অংশ বেড়েছে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালে এমএফএসের মাধ্যমে মোট প্রায় ১৭.৩৭ লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৮.৪২ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালেও এই মাধ্যমের ব্যবহার অব্যাহতভাবে বেড়েছে এবং মাসিক লেনদেনের গড় পরিমাণ প্রায় ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা পর্যায়ে ছিল।
একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ মাধ্যমে বার্ষিক লেনদেনের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য এবং ২০২৬ সালের জুনেও ইন্টারনেট ব্যাংকিং লেনদেনে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও বাড়ছে; দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন এক বছরে ৪৩.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ডিজিটাল অবকাঠামোর গুরুত্ব স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে লেনদেনের আর্থিক মূল্যের হিসাবে বিডি-আরটিজিএস সবচেয়ে বড় অংশ বহন করেছে। একই সময়ে বিইএফটিএন, এনপিএসবি ও বিঅ্যাকপিএসও দেশের আন্তঃব্যাংক অর্থ স্থানান্তর ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট এখন আর শুধু মোবাইল রিচার্জ, ব্যক্তিগত অর্থ পাঠানো বা ছোটখাটো কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ নেই। ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, ই-কমার্সের কেনাকাটা, ব্যবসায়িক অর্থ স্থানান্তর এবং তুলনামূলক বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনও ক্রমেই ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল লেনদেন এখন একটি বিকল্প মাধ্যমের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে
এই অবকাঠামোই এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে কিংবা বিভিন্ন অনুমোদিত ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরকে দ্রুত ও কার্যকর করছে।
বাংলা কিউআর: নগদ থেকে ডিজিটালের সেতু। ছোট দোকান থেকে বড় ব্যবসা—কিউআর কোড এখন ডিজিটাল অর্থপ্রদানের সহজ মাধ্যম। গ্রাহক নিজের ব্যাংক বা অনুমোদিত আর্থিক সেবার অ্যাপ দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারেন।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে মানসম্মত বাংলা কিউআর ব্যবহারের ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর ব্যবস্থার পরিবর্তে আন্তঃব্যবহারযোগ্য একটি কাঠামো গড়ে তোলা। একই কিউআর ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য অনুমোদিত সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে নগদনির্ভর লেনদেনের বিকল্প হিসেবে বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার ব্যবসায়ী বা মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবস্থার আওতায় এসেছিলেন। একই বছরে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় ৬৬ লাখ লেনদেন সম্পন্ন হয়, যার মোট আর্থিক মূল্য ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। সে সময় বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী এবং ৪টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি)।
তবে ২০২৬ সালে বাংলা কিউআরের বিস্তার আরও দ্রুত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে বাংলা কিউআর মার্চেন্টের সংখ্যা ৩৭.৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ যেখানে এই ব্যবস্থার আওতায় মার্চেন্ট ছিল প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার, সেখানে ২০২৬ সালে তা কয়েক গুণ বেড়ে নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলা কিউআরের এই বিস্তারের সঙ্গে নীতিগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মার্চেন্ট পর্যায়ে বাংলা কিউআরকে অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার ফলে বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর ব্যবহারের প্রয়োজন কমেছে। একই কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ বা ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো তাৎক্ষণিক সেটেলমেন্টের সুযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ছোট মার্চেন্টদের জন্য বাংলা কিউআর লেনদেনে তাৎক্ষণিক অর্থ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরভিত্তিক সব মার্চেন্ট পেমেন্টে তাৎক্ষণিক সেটেলমেন্ট নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের পর মার্চেন্টের হিসাবে দ্রুত অর্থ জমা হবে, যা বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল লেনদেনকে আরও উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্টদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন বাড়াতে নতুন প্রণোদনা এবং লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ফলে শুধু মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়ানো নয়, লেনদেনের পরবর্তী পর্যায়ে গ্রাহকের অভিযোগ ও বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলা কিউআর এখন শুধু একটি অর্থ পরিশোধের প্রযুক্তি নয়; এটি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার লেনদেন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে নগদনির্ভরতা থেকে ডিজিটাল কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। মার্চেন্টের বিস্তার, আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা, তাৎক্ষণিক অর্থ নিষ্পত্তি এবং প্রণোদনার সমন্বয়ে বাংলা কিউআর ভবিষ্যতে দেশের ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
এটি শুধু গ্রাহকের সুবিধা নয়; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হলে ব্যবসার অর্থপ্রবাহ বোঝা সহজ হয় এবং ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরিতেও তা সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি বড় সম্ভাবনা ক্ষুদ্র ঋণ। প্রচলিত ব্যবস্থায় অল্প পরিমাণ ঋণের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই ও প্রশাসনিক ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস ও অনুমোদিত তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণের সুযোগ সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের পরিশোধ ব্যবস্থা প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লেনদেনের ইতিহাস ব্যবহার করে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের বিকাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ২ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ‘অত্যন্ত সহজ’ বা সবার জন্য ‘মাত্র কয়েক মিনিটে’ পাওয়া যাবে—এমন সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়। ঋণের সীমা, সুদ বা মুনাফা, গ্রাহকের যোগ্যতা, ঝুঁকি যাচাই এবং অনুমোদনের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতির ওপর নির্ভর করবে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও ডিজিটাল সেবার গুরুত্ব বাড়ছে। মোবাইল আর্থিক সেবা ও এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পথ তৈরি করেছে। ফলে আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে চলা অর্থপ্রবাহের একটি অংশ ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আসার সুযোগ পাচ্ছে।
রেমিট্যান্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নতুন সুযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য এবং প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০২৪ সালে নগদ বাদে এমএফএস চ্যানেলে প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ১০ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০ হাজার ২৩৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এই প্রবৃদ্ধি দেশে প্রবাসী আয় গ্রহণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল আর্থিক সেবার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ও গুরুত্বকে তুলে ধরে।
তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা হুন্ডিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে—এমন দাবি করা বাস্তবসম্মত নয়। বৈধ রেমিট্যান্সের পথ যত দ্রুত, সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের আকর্ষণ কমানোর সুযোগ তত বাড়বে। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস ভবিষ্যতে তাদের আয় ও অর্থপ্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এর ফলে প্রথাগত নথির ঘাটতিতে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রথাগত ও ডিজিটাল ব্যাংকিং: পার্থক্য কোথায়? প্রথাগত ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মূল উদ্দেশ্য একই—গ্রাহকের অর্থ নিরাপদে রাখা, লেনদেনের সুবিধা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা। তবে সেবা প্রদানের পদ্ধতিতে রয়েছে বড় পার্থক্য। প্রথাগত ব্যাংকিং মূলত শাখা, উপশাখা ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামোকেন্দ্রিক। অনেক সেবার জন্য গ্রাহককে সরাসরি ব্যাংকে যেতে হয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তা নিতে হয়।
অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ই-কেওয়াইসি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রাহক ঘরে বসেই অনেক দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবা নিতে পারেন। ফলে সময় ও স্থাননির্ভরতা কমে আসে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়।
গ্রাহক যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। প্রথাগত ব্যাংকে শাখাভিত্তিক যাচাইয়ের পাশাপাশি এখন বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থাও চালু আছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ই-কেওয়াইসি ও দূরবর্তী পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ বেশি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শাখায় উপস্থিত না হয়েও হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে সেবার ধরন ও নিয়ন্ত্রক শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই ভিন্ন হতে পারে।
ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। লেনদেনের ইতিহাস ও অন্যান্য উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিছু ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থায় গ্রাহকের ঋণযোগ্যতা দ্রুত মূল্যায়ন করা সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ডিজিটাল ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত হয়।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে সব পরিস্থিতিতে ‘সেরা’ বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রবীণ গ্রাহক, প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি কিংবা জটিল ব্যাংকিং সমস্যার ক্ষেত্রে সরাসরি কর্মকর্তার সহায়তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নগদ লেনদেন ও কিছু বিশেষ সেবার ক্ষেত্রে ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
তাই ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রথাগত ও ডিজিটাল—এই দুই ধারাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার চেয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সমন্বয় করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি ব্যাংকিংকে দ্রুত ও সহজ করবে, আর মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করবে আস্থা ও জটিল সমস্যার কার্যকর সমাধান।
ডিজিটাল সুবিধার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। ভুয়া ফোনকল, প্রতারণামূলক বার্তা, ভুয়া ওয়েবসাইট, পরিচয় চুরি, ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যের জন্য বড় হুমকি।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ ‘সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, সংস্করণ ১.০’ প্রকাশ করেছে। এতে সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তথ্য সুরক্ষা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, হুমকি পর্যবেক্ষণ, ঘটনা মোকাবিলা, তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে এই সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতিটি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা পরিচালনা কেন্দ্র, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, হুমকি শনাক্তকরণ, দুর্বলতা যাচাই ও আক্রমণ মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রাহককে মনে রাখতে হবে—পিন, এককালীন পাসওয়ার্ড, কার্ডের গোপন তথ্য বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য কাউকে দেওয়া যাবে না।
ডিজিটাল বিভাজন ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তন। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। স্মার্টফোনের মূল্য, ইন্টারনেটের প্রাপ্যতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সচেতনতার পার্থক্য শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করতে পারে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে শুধু অ্যাপ দিয়ে সেবা দিলেই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে না; সহজ ভাষা, গ্রাহক সহায়তা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল আর্থিক শিক্ষা প্রয়োজন।
অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয়তার কারণে ক্যাশিয়ার, কেরানি বা তথ্য প্রবেশের মতো কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তাই প্রচলিত ব্যাংক কর্মকর্তাদের পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
করণীয়: নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুফল সর্বাধিক করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, বিভিন্ন অনুমোদিত আর্থিক সেবার মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের তথ্য ও অর্থের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতারণার ঘটনায় দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও অর্থ উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সেবার মান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক করতে হবে।
ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও নতুন আর্থিক প্রযুক্তিতে পুনঃপ্রশিক্ষণ দিতে হবে। ব্লকচেইনসহ নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে বাস্তব প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আলোকে।
সবুজ ব্যাংকিং ও ভবিষ্যতের অর্থনীতি। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ফলে কাগজের ব্যবহার, শাখায় যাতায়াত এবং কিছু ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন কমতে পারে। এতে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা নিজে থেকেই ‘সবুজ’ হয়ে যায় না; তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক বর্জ্য ও প্রযুক্তির জীবনচক্রও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সবুজ ব্যাংকিংকে শুধু কাগজবিহীন ব্যাংকিং হিসেবে নয়, পুরো প্রযুক্তি-অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে দেখতে হবে।
ব্যাংক যখন হাতের মুঠোয়। ‘ব্যাংকিং প্রয়োজনীয়, ব্যাংক নয়’—বিল গেটসের সঙ্গে বহুল উদ্ধৃত এই বক্তব্যটি ১৯৯৪ সালের প্রযুক্তি-পরিবর্তনের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী সময়ে এটি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতীকী বাক্যে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের বাংলাদেশে সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামোর বিস্তার, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি, মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যাপক ব্যবহার, বাংলা কিউআরের আন্তঃব্যবহারযোগ্যতা এবং নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য অভিপ্রায়পত্র—সব মিলিয়ে ব্যাংকিংয়ের কাঠামো বদলে যাচ্ছে।
তবে লক্ষ্য শুধু নগদ কমানো নয়। একটি সফল ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা হতে হবে নিরাপদ, দ্রুত, সাশ্রয়ী, আন্তঃসংযুক্ত, সহজবোধ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। প্রযুক্তি যদি কেবল শহরের তরুণদের সুবিধা বাড়ায়, তবে ডিজিটাল রূপান্তর অসম্পূর্ণ থাকবে। আবার প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও যদি গ্রাহকের অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ না থাকে, তাহলে আস্থা তৈরি হবে না।
তাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ শুধু ‘হাতের মুঠোয় ব্যাংক’ আনা নয়; সেই হাতের মুঠোয় থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। শাখার দূরত্ব কমেছে, এখন প্রয়োজন আস্থার দূরত্বও কমানো। প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতা, উদ্ভাবনের সঙ্গে জবাবদিহি এবং গতির সঙ্গে নিরাপত্তার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ডিজিটাল ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনে আরও গভীর পরিবর্তন আনতে পারবে।

