প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয় ও মূলধন দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এনআরবি ব্যাংক পিএলসি আর্থিক সূচকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির দাবি করেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট আমানত ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ওপরে। বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে সূচকগুলোর প্রায় সবই ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য, স্বাধীন কোনো মূল্যায়ন সঙ্গে নেই। তাই প্রবৃদ্ধির গল্পের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ও ঋণের কেন্দ্রীভবনের মতো বিষয়ও আলাদা করে দেখা দরকার।
ব্যাংকটি ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। ‘সাধারণ কোনো ব্যাংকের মতো নয়’, এই দর্শনকে সামনে রেখে প্রবাসীদের উদ্যোগে এর প্রতিষ্ঠা। ব্যাংকের দাবি, গত এক দশকে তারা দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও ক্যাশলেস সমাজ গঠনে অবদান রেখেছে। ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ শেয়ার ছেড়ে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির ফলে এর আর্থিক তথ্য প্রকাশে তুলনামূলক বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকেরা তাই নিয়মিত প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংকের কর্মক্ষমতা যাচাই করতে পারেন।
আমানতের প্রবৃদ্ধির হার ব্যাংক বলছে ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে ‘গত পাঁচ বছরে’ আমানত বাড়ার কথা বলা হলেও এই হার বার্ষিক, নাকি পাঁচ বছরের সমষ্টিগত, তা পরিষ্কার নয়। হারটি বার্ষিক হলে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য, আর পাঁচ বছরের মোট হার হলে গতি তুলনামূলক মন্থর। আমানতের তুলনায় ঋণের স্থিতি প্রায় ৭২ শতাংশ, অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে ঋণ দেওয়ার মতো তারল্য আছে। প্রশ্ন হলো সেই সক্ষমতা কতটা ভালো ঋণে রূপ নিচ্ছে। গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি ধরলে গ্রাহকপ্রতি গড় আমানত প্রায় দুই লাখ টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়, যা ব্যাংকের আমানত কাঠামোর একটি ধারণা দেয়। তবে এর কত অংশ প্রবাসীদের, কত অংশ করপোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের, সে তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ব্যাংকের মূল দর্শন প্রবাসীদের সঞ্চয় আনা হলেও আমানতে তাঁদের অংশ কতটা, তা জানা গেলে লক্ষ্য ও বাস্তবতার মিল সহজে বোঝা যেত।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি বছরে গড়ে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছে বলে জানিয়েছে। এটি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সরাসরি সংগতিপূর্ণ এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে বছরভিত্তিক ধারা, অর্থাৎ রেমিট্যান্স বাড়ছে না কমছে, তা না জানলে এই সংখ্যার তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না।
খেলাপি ঋণের চিত্রে ব্যাংকটি অগ্রগতি দেখাতে চেয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে এবং ২০২৫ সালে এর হার ৭ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমেছে। এখানে একটি অস্পষ্টতা আছে। ‘৬ শতাংশ কমা’ বলতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ শতাংশ কমেছে, নাকি হার ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে, তা স্পষ্ট নয়। দুটির অর্থ অনেক আলাদা, তাই সংখ্যাটি মূল সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। যেভাবেই দেখা হোক, ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ হার এখনো উচ্চ। ঋণের মান ও আদায় ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতির সুযোগ থাকার ইঙ্গিত এতে মেলে। বিশেষ করে ঋণের বড় অংশ করপোরেট খাতে থাকায় বড় কয়েকটি ঋণ খেলাপি হলে হারে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ঋণের বিন্যাস নিয়েও কিছু বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ব্যাংকের মোট ঋণের ৬০ দশমিক ৮৮ শতাংশ গেছে করপোরেট খাতে, ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ এসএমই ও কৃষিতে এবং ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ রিটেইল বা কনজ্যুমার খাতে। ব্যাংক একে ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য বলছে। কিন্তু ঋণের ছয় ভাগের বেশি একটি খাতে কেন্দ্রীভূত থাকা বৈচিত্র্যের চেয়ে বরং করপোরেট নির্ভরতাই বেশি দেখায়। অন্যদিকে এসএমই ও কৃষিতে এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি ঋণ কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য ইতিবাচক। উল্লেখ্য, তিন খাতের শতাংশ যোগ করলে মোট ১০০ হয় না, সামান্য ঘাটতি থাকে। অবশিষ্ট অংশ কোন খাতে গেছে, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
মূলধনের দিক থেকে ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাসেল-৩ কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। এনআরবি ব্যাংক ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশ ধরে রেখেছে, অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সীমার ওপরে প্রায় ১ দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্টের নিরাপত্তা বলয় আছে। এটি ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতার একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের বিপরীতে এই বলয় কতটা স্থায়ী, তা নির্ভর করবে ঋণের মান ও মুনাফার ওপর। ব্যাংকের মুনাফা ও সঞ্চিতি ঘাটতির তথ্য প্রতিবেদনে না থাকায় পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।
সেবা নেটওয়ার্কে ব্যাংকটির ৫৬টির বেশি শাখা, ৫৩টির বেশি উপশাখা এবং ৩৫০টির বেশি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা শাখার তুলনায় অনেক বেশি, যা ব্যয় কমিয়ে প্রান্তিক এলাকায় সেবা পৌঁছানোর কৌশলের প্রতিফলন। প্রবাসী পরিবারগুলোর বড় অংশ গ্রামাঞ্চলে থাকায় এই নেটওয়ার্ক রেমিট্যান্স বিতরণে সুবিধা দিতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকটি প্রযুক্তি ও অটোমেশনে জোর দিচ্ছে। নিজস্ব অ্যাপ ‘এনআরবি ক্লিক’ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে মাত্র দুই মিনিটে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পিসিআই-ডিএসএসের সনদ এবং দ্বিস্তর লেনদেন প্রটোকল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। দ্রুত অ্যাকাউন্ট খোলা বিদেশে থাকা প্রবাসীদের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে অ্যাপ কতজন ব্যবহার করছেন এবং ডিজিটাল লেনদেনের অনুপাত কত, সে তথ্য না থাকায় এর বাস্তব প্রভাব মাপা কঠিন।
পরিবেশবান্ধব অর্থায়নে ব্যাংকটি সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও ইএফটিপি যুক্ত কারখানায় স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ২২ কোটি টাকা ও টেকসই অর্থায়নে ৭৫৭ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। দুটি অঙ্কের ব্যবধান বিপুল। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে সরাসরি অর্থায়ন তুলনামূলক সামান্য, আর টেকসই অর্থায়নের সংজ্ঞা অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত। এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, সবুজ অর্থায়নের মূল চাপ এখনো সীমিত পরিসরে। ব্যাংকে প্রায় ১ হাজার ৬২৭ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং প্রতিবছর শতকোটি টাকার বেশি ভ্যাট ও কর সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যাংকটি আগামী পাঁচ বছরে ক্যাশলেস ব্যাংকিং ত্বরান্বিত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ওপেন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়ার কথা বলছে। এর অংশ হিসেবে ওরাকল ফ্লেক্সকিউবের ১৪ দশমিক ৮ সংস্করণে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হচ্ছে। এ ধরনের হালনাগাদ লেনদেনের গতি ও নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে বাস্তবায়নের সময়সীমা, ব্যয় ও প্রত্যাশিত ফল প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
সব মিলিয়ে এনআরবি ব্যাংকের আমানত, মূলধন পর্যাপ্ততা ও ডিজিটাল সেবার অগ্রগতি দৃশ্যমান, যা প্রবাসীদের প্রতি আস্থার একটি ইঙ্গিত। তবে ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ, করপোরেট খাতে ঋণের কেন্দ্রীভবন এবং আমানতে প্রবাসীদের প্রকৃত অংশ নিয়ে স্পষ্ট তথ্যের অভাব ব্যাংকটির সামনের চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নির্ধারণ করবে ব্যাংকটি প্রবাসী আমানত ও রেমিট্যান্স কতটা বাড়াতে পারে এবং ঋণের মান কতটা উন্নত করতে পারে।

