আমানত বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এনবিএফসি) বকেয়া ঋণের স্থিতি বা মোট ঋণের পরিমাণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এপ্রিল-জুন (দ্বিতীয় প্রান্তি) প্রান্তিকের উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোতে তহবিল সংগ্রহ বাড়লেও ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপরীতমুখী গতিধারা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সুশাসনের অভাব এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন ঋণ সম্প্রসারণের চেয়ে বকেয়া ঋণ আদায় ও পুরোনো হিসাব সমন্বয়ের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জুন প্রান্তিক শেষে এনবিএফসি খাতের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকায় (৭৮১.১৫ বিলিয়ন টাকা), যা মার্চ প্রান্তিকের ৭৮ হাজার ৪২৫ কোটি টাকার চেয়ে ৩১০ কোটি টাকা কম। অথচ এই একই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন আমানত জমা বেড়েছে প্রায় ১.৫৫ শতাংশ বা ৭৯৮ কোটি টাকা, যার ফলে মোট আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায়। শুধু ঋণের পরিমাণই নয়, বরং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ গ্রাহকের সংখ্যাও কমেছে। তিন মাসের ব্যবধানে মোট ঋণ হিসাব ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৫ থেকে কমে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৭২-এ নেমে এসেছে, যার মধ্যে একক গৃহস্থালি বা ব্যক্তিশ্রেণির গ্রাহক সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ২৭৪টি।
তবে নতুন ঋণ বিতরণের (ডিসবার্সমেন্ট) হার কিন্তু একদম বন্ধ হয়নি; বরং চলতি প্রান্তিকে নতুন ঋণ বিতরণ পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে ২.৮২ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২.৬০ শতাংশ বেড়েছে। মূলত টেক্সটাইল ও শিল্প খাত সর্বাধিক ৪৬.১৪ শতাংশ, বাণিজ্য ও ব্যবসা খাত ২৪.৬১ শতাংশ এবং ভোক্তা অর্থায়ন ১৪.৩০ শতাংশ ঋণ পেয়েছে। তবে নতুন ঋণ বিতরণের পরেও মোট ঋণ স্থিতি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন; যে পরিমাণ নতুন ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ মূলধন পরিশোধ, খেলাপিকৃত অর্থ আদায় কিংবা ঋণ অবলোপনের (রাইট-অফ) মাধ্যমে ব্যাংকে ফিরে আসছে।
গবেষণাসংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে জানান যে, নতুন বিতরণ বাড়ার পরও মোট ঋণ স্থিতি কমে যাওয়া প্রমাণ করে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পোর্টফোলিও বড় করার চেয়ে পুরোনো খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আদায়ে বেশি মনোযোগী। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাজারে আমানত সংগৃহীত হলেও আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেই আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ঝুঁকি এড়িয়ে সঠিক ও উৎপাদনশীল খাতে পুনরায় বিনিয়োগ করা।
মালিকানার ভিত্তিতে তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের এনবিএফসিগুলোতেই ঋণ স্থিতি সবচেয়ে বেশি কমেছে। তিন মাসে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ৫৬১ কোটি টাকা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায়। বিপরীতে, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ২৫১ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায়। অন্যদিকে জমাকৃত আমানতের সিংহভাগই (৯৬.১৪ শতাংশ বা ৫০,৩৩৮ কোটি টাকা) মেয়াদি বা স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা আছে। ভৌগোলিক বিস্তৃতির ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য রয়েছে; মোট আমানতের প্রায় ৯১.৯৭ শতাংশ (৪৮,১৫২ কোটি টাকা) জমা হয়েছে এককভাবে ঢাকা বিভাগে, যেখানে বরিশাল বিভাগের অবদান ছিল মাত্র ০.১৬ শতাংশ। এছাড়া ব্যবসা খাতে নারী উদ্যোক্তাদের আমানতের হিস্যা পুরুষদের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য (মাত্র ০.৩৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষ উদ্যোক্তাদের হিস্যা ৪.৫৭ শতাংশ)।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল করপোরেট গভর্নেন্সের কারণে এনবিএফসি খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে ভুগছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এর আগে বেশ কয়েকটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬’-এর আওতায় আরও চারটি অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে সেগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ ও অবসায়নের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন কঠোর পদক্ষেপের মুখে নিজেদের মূলধন সুরক্ষিত রাখতে এনবিএফসিগুলো এখন আগ্রাসী ঋণের পথ ছেড়ে সতর্কতামূলক অবস্থানে ফিরে আসছে।

