বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি খাতে আবারও ইতিবাচক গতি দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূলত তৈরি পোশাক খাতের ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো, পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতের ভালো ফলাফলের কারণে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।
তবে সেপ্টেম্বর মাসের রপ্তানি আয় আগস্ট মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে। আগস্টে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বরের তুলনায় প্রায় ১১ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মাসভিত্তিক হিসাবে কিছুটা কমলেও বার্ষিক তুলনায় রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক উন্নতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা ও সক্ষমতা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক খাত। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১০ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
শুধু সেপ্টেম্বর মাসের হিসাবেও পোশাক খাত ভালো করেছে। এ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
পোশাক খাতের দুটি প্রধান অংশের মধ্যেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ৪ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়া, ক্রেতাদের নতুন কার্যাদেশ এবং কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রপ্তানি আয় বাড়লেও এখনো পোশাকের প্রকৃত পরিমাণ বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে আগের মতো পূর্ণ পুনরুদ্ধার হয়নি।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক রপ্তানির মূল্য বাড়লেও রপ্তানির পরিমাণ একই হারে বাড়েনি। তার মতে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি তুলনামূলক দুর্বল থাকায় এ বছরের প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় পোশাকের একক মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মোট রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে নতুন কার্যাদেশ দিচ্ছে, তবে পোশাক খাতে এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী সময়ে এই খাতে আরও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে।
শুধু পোশাক নয়, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভালো করেছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের চামড়া শিল্প নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারছে।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রথম তিন মাসে এই খাতের রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি প্রথম তিন মাসে বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। একই সময়ে গৃহস্থালি বস্ত্র রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর মাসে বার্ষিক হিসাবে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ওষুধ রপ্তানিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। শুধু সেপ্টেম্বর মাসে এই খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
তবে সব খাতে একই ধরনের উন্নতি হয়নি। কৃষিপণ্য, হিমায়িত মাছসহ কয়েকটি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সবজি, চা, ফল, সিরামিক, রাবার, তুলা ও কিছু তৈরি পণ্যের রপ্তানিও কমেছে। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎপাদন বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রপ্তানি বাজারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ২ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাজ্য ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। এ সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এরপর রয়েছে জার্মানি, যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে নতুন বাজারগুলোর মধ্যেও কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ২১০ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের ১০৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১০০ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি।
ভারত ও জাপানও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। উভয় দেশেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল।
সেপ্টেম্বরের রপ্তানি তথ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের পুনরুদ্ধার, ওষুধ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য শিল্প খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধান, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বর্তমান প্রবণতা বলছে, রপ্তানি খাত ধীরে ধীরে চাপ কাটিয়ে উঠছে। তবে স্থায়ী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি সহায়তা, শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া।

