দেশের ভোজ্যতেলের বাজার আবারও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে স্থানীয় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমান দামে তেল বিক্রি করতে গিয়ে তারা লোকসানের মুখে পড়ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে আমদানি কমে যেতে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে আগামী রমজান মাসকে সামনে রেখে এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ রমজানে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভ্যানস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনটি আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে নতুন মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বর্তমানে প্রতি টন প্রায় ১ হাজার ৩২৫ ডলারে উঠেছে। এর আগে দেশের বাজারে সর্বশেষ দাম সমন্বয়ের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ২৭০ ডলার। তারও আগে দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারের কাছাকাছি।
পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, বর্তমান আন্তর্জাতিক দামে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে তাদের প্রায় ১৭ টাকা লোকসান হচ্ছে। তবে লোকসান সত্ত্বেও তারা দেশের বাজারে সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র খোলার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
তাদের বক্তব্য, সরকার আগে জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে তেলের দাম সমন্বয় করা হবে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা আমদানিতে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা ভবিষ্যতে বাজারে সরবরাহ সমস্যার কারণ হতে পারে।
ভোজ্যতেলের বাজারে এর আগেও কয়েকবার সরবরাহ সমস্যা দেখা গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে তেলের সংকট তৈরি হওয়ার পর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়েছিল।
এরপর জুলাই মাসেও বাজারে আবার সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আলোচনার পর গত ২ সেপ্টেম্বর সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়।
সর্বশেষ মূল্য কাঠামো অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮৫ টাকা করা হয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই আবারও দাম বাড়ানোর আবেদন আসায় বাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রমজানের মতো উচ্চ চাহিদার সময়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, পরিশোধনকারীদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই না করে তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
সম্প্রতি সিলেটে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের এই অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য নয়, আরও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ।
আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, তাহলে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজার মূলত আমদানিনির্ভর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ থেকে ২৬ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি করা হয়। দেশের মোট ভোজ্যতেলের চাহিদাও ২২ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে।
বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বাড়লেও আমদানি খরচ বৃদ্ধি পায়।
তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু দাম বাড়ানো নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা, আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
রমজানের আগে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ভোজ্যতেলের বাজার আবারও একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্থিতিশীল না হলে এবং আমদানি ব্যয় না কমলে ভবিষ্যতে বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রমজানের আগে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

