ব্যস্ত সময়ের আগে বাড়তি ঘুমিয়ে নিলে কি পরে রাত জাগার ধকল সামলানো সহজ হয়? চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতার নাম ‘স্লিপ ব্যাংকিং’, অর্থাৎ ভবিষ্যতের ঘুমের ঘাটতি মোকাবিলায় আগেভাগে ঘুম জমিয়ে রাখা। কিছু গবেষণা বলছে, কৌশলটি কাজ করে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ঘুম ব্যাংকের টাকার মতো সঞ্চয় করা যায় না।
সপ্তাহের কাজের চাপে ঘুমের যে ঘাটতি তৈরি হয়, ছুটির দিনে অনেকেই তা পুষিয়ে নিতে চান। অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও এক ঘণ্টা শুয়ে থাকা এই অভ্যাসেরই অংশ। কিন্তু প্রশ্নটা যদি উল্টো দিক থেকে করা হয়? সামনে যদি এমন কোনো সময় আসে, যখন ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগ থাকবে না, তখন কি আগে থেকেই বাড়তি ঘুমিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব? এই ভাবনা থেকেই ‘স্লিপ ব্যাংকিং’ ধারণার জন্ম।
সহজ করে বললে, কম ঘুমের সময় শুরু হওয়ার আগে কয়েক রাত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানোকেই স্লিপ ব্যাংকিং বলা হয়। এর সমর্থক গবেষকদের বক্তব্য, এতে মস্তিষ্ক এক ধরনের রিজার্ভ তৈরি করে রাখে। ফলে পরে ঘুম কম হলেও মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা তুলনামূলক ভালো থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে স্বাস্থ্যসচেতন তরুণদের মধ্যে এটি এখন বেশ আলোচিত। দীর্ঘ বিমানযাত্রা বা বড় কোনো কাজের আগে অনেকে একে ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষাবলয় হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে জনপ্রিয়তা আর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক জিনিস নয়, তাই গবেষণার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ধারণাটি প্রথম আলোচনায় আসে ২০০৯ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল্টার রিড আর্মি ইনস্টিটিউট অব রিসার্চের একদল গবেষক সেনাসদস্যদের ওপর একটি পরীক্ষা চালান। গবেষণাদলের নেতৃত্বে ছিলেন ট্রেসি র্যাপ।
পরীক্ষায় অংশ নেন ২৪ জন সেনাসদস্য। তাঁদের দুই দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে প্রতি রাতে সাত ঘণ্টা এবং অন্য দলকে ১০ ঘণ্টা বিছানায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। পরের সপ্তাহে দুই দলেরই ঘুমের সময় কমিয়ে মাত্র তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়।
ফল ছিল লক্ষণীয়। যাঁরা আগে ১০ ঘণ্টা করে ঘুমিয়েছিলেন, তাঁরা কম ঘুমের ধকল অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে সামলাতে পেরেছেন। সতর্কতা ও মনোযোগের মাপকাঠিতেও তাঁরা এগিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ আগাম বাড়তি ঘুমের একটি সুরক্ষামূলক প্রভাব দেখা গেছে।
এরপর আরও কয়েকটি গবেষণায় একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির একটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়ে একটি সমীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, নাইট শিফট শুরুর আগে টানা তিন রাত প্রতিদিন ৯০ মিনিট বেশি ঘুমালে কাজের সক্ষমতা বাড়ে। যাঁদের কাজে ভুলের মাশুল অনেক বেশি, সেই চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এ ফল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ক্রীড়াঙ্গনেও এর প্রভাব খুঁজেছেন গবেষকেরা। রাগবি খেলোয়াড়েরা তিন সপ্তাহ ধরে রাতে ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে শারীরিক ক্লান্তির মাত্রা কমাতে পেরেছেন। টেনিস খেলোয়াড়েরা এক সপ্তাহ প্রতি রাতে ৯ ঘণ্টা ঘুমিয়ে সার্ভ করার দক্ষতা বাড়িয়েছেন। বাস্কেটবলারদের ক্ষেত্রে বেশি ঘুমের ফলে ক্ষিপ্রতা ও লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা বেড়েছে বলে জানা গেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এসব গবেষণার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত এবং পরিবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত। দৈনন্দিন জীবনের জটিলতার মধ্যে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব বিশেষজ্ঞ এই তত্ত্বে একমত নন। অনেকের যুক্তি, বাড়তি ঘুম আসলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় নয়, বরং অতীতের জমে থাকা ঘুমের ঋণ শোধ। আধুনিক জীবনে বহু মানুষ নিয়মিতই প্রয়োজনের চেয়ে কম ঘুমান। তাঁরা যখন বেশি ঘুমান, তখন আসলে ঘাটতিই মেটাচ্ছেন, নতুন কোনো মজুত তৈরি করছেন না।
হ্যাকেনস্যাক মেরিডিয়ান স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. পিটার পোলসের মতে, ঘুমের সময় শরীরে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলে। হরমোন ও বিপাকজনিত অসামঞ্জস্য ঠিক হয় তখনই। মস্তিষ্কের জন্য এটি চিন্তা গুছিয়ে নেওয়ার সময়ও।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. মাইকেল হাওয়েল বলেন, শরীরের অগণিত কোষের মেরামতে ঘুম অপরিহার্য। সারা দিন মস্তিষ্ক ও শরীরে যে বর্জ্য জমে, ঘুমের সময়ই তা পরিষ্কার হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার। তাঁর ভাষ্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না মিললে মস্তিষ্ক এই পরিষ্কারের কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। ফলে পরদিন মনোযোগ ধরে রাখা বা নতুন কিছু শেখা কঠিন হয়ে যায়।
যাঁরা স্লিপ ব্যাংকিং করতে চান, তাঁদের জন্য ডা. হাওয়েলের পরামর্শ স্পষ্ট। ব্যস্ত সময় শুরুর এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে থেকে প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট বেশি ঘুমাতে হবে। হঠাৎ করে এক রাতে অনেকটা বেশি ঘুমানোর চেয়ে ধাপে ধাপে অভ্যাস গড়াই তাঁর কাছে বেশি কার্যকর।
সকাল ও রাতের মধ্যে কোনটি ভালো, সে প্রশ্নেও দুই চিকিৎসকের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। ডা. হাওয়েল মনে করেন, সকালে অ্যালার্ম দেরিতে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। কারণ বেশির ভাগ মানুষ আগে ঘুমানোর চেয়ে দেরিতে ঘুম থেকে উঠতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অন্যদিকে ডা. পোলসের মত, যাঁদের সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠতেই হয়, তাঁদের জন্য রাতে আগে শুয়ে পড়াই ভালো। দিনের বেলায় অল্প সময়ের ঘুম বা ‘ন্যাপ’ নেওয়াও কার্যকর উপায় হতে পারে বলে তিনি জানান।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্লারম্যান ধারণাটির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাঁর তুলনাটি বেশ স্মরণীয়। তাঁর মতে, ঘুম পিগি ব্যাংকের মতো নয়, বরং ক্রেডিট কার্ডের মতো। ঘুমের ঋণ করা যায়, কিন্তু আগাম উদ্বৃত্ত জমানো যায় না।
তিনি আরও বলেন, ক্লান্ত না থাকলে মানুষের পক্ষে ঘুমানো কঠিন। তাই ইচ্ছামতো বাড়তি ঘুম আদায় করা সহজ নয়। তাঁর বড় উদ্বেগ অন্য জায়গায়। স্লিপ ব্যাংকিং কার্যকর ভেবে কেউ যদি ইচ্ছা করে কম ঘুমানো শুরু করেন, সেটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে। ন্যাপ নিয়েও তিনি সতর্ক করেছেন। ৪৫ মিনিটের বেশি দিনের ঘুমের তিনি পক্ষে নন। কারণ এতে ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ দেখা দিতে পারে, অর্থাৎ ঘুম থেকে ওঠার পরও মাথা ভারী হয়ে থাকে ও আচ্ছন্ন ভাব কাটে না।
দুই পক্ষের মতামত পাশাপাশি রাখলে একটি মিল চোখে পড়ে। স্লিপ ব্যাংকিংয়ের সমর্থক ও সমালোচক, উভয় পক্ষই মনে করেন, রাতে পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের জন্য উপকারী। বিতর্ক মূলত এই প্রশ্নে যে, বাড়তি ঘুম কি সত্যিই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত থাকে, নাকি পুরোনো ঘাটতিই পূরণ করে।
বাস্তব জীবনের জন্য এর অর্থ দাঁড়ায় কয়েকটি। প্রথমত, যাঁদের সামনে অনিবার্যভাবে কম ঘুমের সময় আসছে, যেমন নাইট শিফট, দীর্ঘ যাত্রা বা পরীক্ষার চাপ, তাঁদের জন্য আগে থেকে কিছুটা বাড়তি ঘুমানো ক্ষতিকর নয়, বরং সহায়ক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটিকে নিয়মিত কম ঘুমানোর অজুহাত বানানো যাবে না। তৃতীয়ত, একটানা অনেক বেশি ঘুমানোর চেয়ে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো এবং ন্যাপ সংক্ষিপ্ত রাখা নিরাপদ।
ডা. পোলস স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্লিপ ব্যাংকিংকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ভাবা ঠিক নয়। এটি সব সমস্যার জবাব নয়। বরং নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসই সুস্থ থাকার সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ।
ঘুম ভবিষ্যতের জন্য জমানো যায় কি না, এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর বিজ্ঞান এখনো দেয়নি। তবে সেনাসদস্য, চিকিৎসক ও খেলোয়াড়দের নিয়ে হওয়া কিছু গবেষণা আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতাও উপেক্ষা করার মতো নয়। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষ প্রয়োজনে সামান্য বাড়তি ঘুম সেই অভ্যাসের পরিপূরক হতে পারে, বিকল্প নয়।

