জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিট বা এলটিইউ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কাছে ১৪ বছরের পুরোনো ৪৬৮ কোটি টাকার আয়কর বিরোধ মেটানোর তাগিদ দিয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক নোটিশে আগামী ১২ অক্টোবরের মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতির মাধ্যমে এ বিষয়ে দালিলিক প্রমাণসহ ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। মূলত উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর কর্তৃপক্ষ। ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাংবাদিক দৌলত আক্তার মালার একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে পুঞ্জীভূত এই কর বিরোধের ব্যাপ্তি ১৪টি আয়বর্ষজুড়ে বিস্তৃত। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় অঙ্কের বিরোধটি ২০২০ থেকে ২০২১ আয়বর্ষের, যার পরিমাণ ১৮২ কোটি টাকা। এর পরই রয়েছে ২০১৯ থেকে ২০২০ আয়বর্ষের ১২২ কোটি টাকার কর বিরোধ। এই দুই বছর মিলিয়ে মোট বিরোধের পরিমাণ প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা, যা মোট পাওনার প্রায় ৬৫ শতাংশ। এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১০ আয়বর্ষের জন্য ৫১ কোটি ৮২ লাখ, ২০১৮ থেকে ২০১৯ আয়বর্ষের জন্য ৩৫ কোটি ৩০ লাখ এবং ২০২১ থেকে ২০২২ আয়বর্ষের ২৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার কর নিয়ে আইনি জটিলতা চলছে। এমনকি ১৯৯৭ সালের আয়বর্ষ যা ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ করবর্ষের সমতুল্য থেকে শুরু করে ২০০২ ও ২০০৯ সালের বেশ কিছু পুরোনো মামলার নিষ্পত্তিও এখনও ঝুলে আছে।
সরকারি নির্দেশনা ও এডিআরের কার্যকর ভূমিকা
উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা কর মামলাগুলোর কারণে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে গত ৬ জুলাই এনবিআর একটি বিশেষ নির্দেশনা জারি করে। পরবর্তী সময়ে গত ১৩ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে এডিআরের মাধ্যমে আদালতের বাইরে এসব কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর জোর দেওয়া হয়। এডিআর হলো এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে করদাতা এবং কর কর্তৃপক্ষ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় এড়িয়ে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে পারে। সরকার মনে করছে, প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এই বিকল্প পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আটকে থাকা অর্থ দ্রুত জমা হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এস আলমের রেখে যাওয়া ক্ষত ও ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান দশা
তবে বিশাল অঙ্কের এই বকেয়া কর পরিশোধের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান বেশ নাজুক। একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতে সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত গত কয়েক বছরে অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ব্যাংকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামালউদ্দীন জসিম জানিয়েছেন, আর্থিক সক্ষমতা থাকলে ব্যাংক সবসময়ই বকেয়া কর পরিশোধে আগ্রহী। কিন্তু ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থা এত বিপুল অঙ্কের কর মেটানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের হস্তক্ষেপে ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পর থেকেই মূলত ব্যাংকটির ধারাবাহিক আর্থিক অবনতি শুরু হয়।
ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে, ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকটির মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, অথচ আমানতকারীদের মুনাফা ঠিকই পরিশোধ করতে হয়েছে। এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অনুকূলে বের করে নেয়। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বা এনপিএল চিত্রে। গত জুন মাস পর্যন্ত দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল ইসলামী ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায়, যা তাদের বিতরণকৃত মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পূর্ববর্তী সরকারের পতন হলে ব্যাংকটি ওই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
আইনি সুরক্ষা ও কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তা
তত্ত্বগতভাবে এডিআর পদ্ধতি উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সমাধান মনে হলেও, এর সফল বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু পদ্ধতিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা রয়েছে। এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের সাবেক সদস্য ও সাবেক এডিআর ফ্যাসিলিটেটর সৈয়দ আমিনুল করিম এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তার মতে, এডিআর প্রক্রিয়ার সফলতার জন্য করদাতা এবং কর কর্মকর্তা উভয়েরই আন্তরিক সদিচ্ছা থাকতে হয়। নিছক সময়ক্ষেপণের উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতির ব্যবহার কাম্য নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এডিআর আইনে কিছু যৌক্তিক সংশোধন আনা প্রয়োজন। কারণ আপসের মাধ্যমে রাজস্ব কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও দ্রুত আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় এনবিআর কর্মকর্তারা সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হওয়ার আশঙ্কায় ভোগেন। আইনি সুরক্ষার অভাব থাকলে কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে চাইবেন না।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের এই কর বিরোধ নিষ্পত্তি এখন কেবল আইনি বা কর প্রশাসনের বিষয় নয়, এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় একটি প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একদিকে এনবিআরের দ্রুত রাজস্ব আদায়ের চাপ, অন্যদিকে বিপুল খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ইসলামী ব্যাংকের টিকে থাকার সংগ্রাম সব মিলিয়ে এডিআর পদ্ধতি ঠিক কতটা কার্যকর সমাধান নিয়ে আসতে পারে, তা নির্ধারণ করবে আগামী ১২ অক্টোবরের মধ্যে ব্যাংকের জমা দেওয়া ব্যাখ্যা ও প্রমাণাদি।

