বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে যখন তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় নিয়ে দেশীয় ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছে, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে দেশে পরিচালিত বিদেশি ব্যাংকগুলো। পর্যাপ্ত তারল্য এবং আইনি সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও বা মূলধন ধরে রেখে ব্যবসা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সার্বিক মুনাফায় নজিরবিহীন পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ গবেষণামূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ ৩.১ শতাংশ বাড়লেও কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে ১,৪৯৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই সাথে অত্যন্ত কড়া নজরদারির মধ্যে সাবধানে ঋণ বিতরণ করা সত্ত্বেও এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৬.৫ শতাংশে ঠেকেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৬.১ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা সাধারণ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের চেয়ে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ওপর বেশি নির্ভর করে। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭,৩৭৮ কোটি টাকা, যার বড় অংশই চলতি ও সঞ্চয়ী আমানত। ব্যাংক ব্যবসার ভাষায় কারেন্ট ও সেভিংস অ্যাকাউন্টকে বলা হয় লো-কস্ট ডিপোজিট বা স্বল্প খরচের তহবিল, কারণ এই হিসাবগুলোতে গ্রাহকদের খুব নামমাত্র বা শূন্য সুদে টাকা রাখা যায়। ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ মাত্র ৪৮,৭০৪ কোটি টাকা, যা আমানতের অর্ধেকেরও কম। অর্থাৎ আমানত ও ঋণের অনুপাত অত্যন্ত সুরক্ষিত হলেও তাদের বিতরণ করা ঋণের ৭৩ শতাংশই আটকে আছে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিশ্বব্যাপী মন্দার কারণে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা উর্ধ্বমুখী হয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য এখনো বজায় রয়েছে। দেশীয় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলোর লেটার অফ ক্রেডিট বা এলসি -কে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮.৬ শতাংশ বা ৩৯৪ কোটি মার্কিন ডলার এবং মোট আমদানি খরচের ১৩.৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। বৈদেশিক বাণিজ্যের কমিশন থেকে ভালো আয় হলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ মন্দা এবং আন্তর্জাতিক সুদহারের ওঠানামার কারণে তাদের কর-পূর্ব মুনাফা আগের বছরের ৪,৪৫২ কোটি টাকা থেকে ১৮.৪ শতাংশ কমে ৩,৬৩২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
মুনাফায় বড় পতন ঘটলেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে তাদের নিজস্ব হেড অফিসে লভ্যাংশ ও আয় বাবদ অর্থ পাঠানোর গতি থেমে নেই। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এসব ব্যাংক ১,৫৭০ কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫.৩ শতাংশ বেশি। দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ মাত্র ৪ শতাংশ এবং মোট ঋণে তাদের অবদান ২.৭ শতাংশের মতো ছোট হলেও, সরকারের ঋণের বড় অংশ যোগান দিতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সচল রাখতে তারা বড় ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের ১২.৪ শতাংশই ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার হার বা ‘ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও’ থাকতে হয় ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ। অথচ বিদেশি ব্যাংকগুলোর এই হার বর্তমানে ৪১.২১ শতাংশ, যা দেশের যেকোনো সার্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য এক অবিশ্বাস্য শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি। তাদের তারল্য আচ্ছাদন অনুপাত নির্ধারিত সীমার কয়েক গুণ উঁচুতে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলো তাদের উচ্চ মূলধন সুরক্ষা বলয় বজায় রাখতে গিয়ে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ বা নতুন কোনো দেশীয় ব্যবসায় ঋণ বাড়াতে চাইছে না। ফলে তাদের ব্যালেন্স শিট নিরাপদ থাকলেও কমছে নতুন প্রবৃদ্ধি এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা।

