আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন প্রায় ১২০ কোটি তরুণ। কিন্তু এই সময়ে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হবে মাত্র ৪০ কোটির মতো। ফলে চাহিদা ও সুযোগের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটির বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিকে আগামী প্রজন্মের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। আজ শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার মূল অধিবেশনে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন।
ভাষণে উন্নয়নের আগামী ৫০ বছরের রূপরেখা তুলে ধরেন বাঙ্গা। তাঁর মতে, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত চলছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বেড়েছে এবং ঋণের বোঝা ভারী হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও উঁচু পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বে জনসংখ্যার কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। তাই উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত পদ্ধতিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে বলে মত দেন তিনি।
কর্মসংস্থানের এই ব্যবধানের মানবিক দিকটিও তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। তাঁর ভাষ্য, এর অর্থ এমন একজন তরুণী, যাঁর ডিগ্রি আছে কিন্তু চাকরি নেই। কিংবা এমন একজন তরুণ, যাঁর পেশাগত দক্ষতা আছে কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। একটি প্রজন্ম তখন প্রশ্ন করবে, তাদের জন্য কি কোনো সুযোগ আছে। বাঙ্গা বলেন, চাকরি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি মর্যাদার বিষয়। কর্মসংস্থান একজন তরুণকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ দেয়। এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো না গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব এক দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না। আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে তার সুফলও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি কেবল একটি দেশের বিষয় নয়, বরং সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ বলে মনে করেন তিনি।
উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও কথা বলেন বাঙ্গা। তাঁর মতে, সরকারি অর্থ, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। তবে সব দেশের জন্য একই কাঠামো কার্যকর হবে না। দেশের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী অর্থায়নের সমন্বয় বদলাতে হবে। যেসব দেশে প্রয়োজন ও ঝুঁকি বেশি, সেখানে সরকারি অর্থায়ন ও স্বল্পসুদের উন্নয়ন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থা গড়া, যেখানে দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
বাঙ্গার ব্যাখ্যায় প্রতিটি উৎসের আলাদা ভূমিকা আছে। যেখানে বাজার এখনো কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে থাকবে সরকারি অর্থ। কর্মসংস্থান তৈরি ও বিনিয়োগ বাড়াতে কাজে লাগানো হবে বেসরকারি পুঁজি। নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের প্রাথমিক ঝুঁকি নেবে দাতব্য অর্থায়ন। আর প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ডলারের কার্যকারিতা বাড়ানো হবে।
বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অগ্রগতির তথ্যও দেন তিনি। ২০২২ অর্থবছরে গ্রুপের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ হয়েছিল। গত অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ তিন বছরে পরিমাণ তিন গুণের বেশি হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নের সঙ্গে যোগ করলে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বাঙ্গা জানান, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে হয়েছে চার গুণ। আফ্রিকাজুড়েও এই অর্থায়ন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
উন্নয়ন অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে নতুন একটি উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক যৌথভাবে একটি নতুন কাঠামো তৈরির কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্যায়ন, নথিভুক্তকরণ, বিনিয়োগের উপযোগী করে সাজানো এবং এক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অন্যজনের কাছে হস্তান্তরের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি চালু করা।
বাঙ্গার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পে একটি উন্নয়ন ব্যাংক অর্থায়নের পর সেটি অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তর করতে পারলে প্রথম প্রতিষ্ঠানের অর্থ নতুন প্রকল্পে ব্যবহার করা যাবে। এতে একই মূলধন দিয়ে আরও বেশি প্রকল্পে অর্থায়ন সম্ভব হবে। এমন ব্যবস্থা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাজারে কার্যকর হলে উদীয়মান বাজারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ঘিরে নতুন একটি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদশ্রেণি তৈরি হতে পারে। তখন উন্নয়ন অর্থায়ন আর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ভাষণের শেষ দিকে বাঙ্গা বলেন, গত প্রজন্মের উন্নয়ন কাঠামো হুবহু অনুসরণ না করে আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নতুন ব্যবস্থা গড়তে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, কর্মসংস্থান ঘাটতির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেটিই অনিবার্য বাস্তবতা নয়। পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ আছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ইতিমধ্যে নতুন অর্থায়ন কাঠামোর সম্ভাবনা দেখাতে শুরু করেছে। এখন সেটিকে আরও বড় পরিসরে ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সতর্কবার্তা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছেন, অথচ নতুন চাকরির সুযোগ সেই গতিতে বাড়ছে না। ফলে ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়ার চিত্র আরও প্রকট হওয়ার ঝুঁকি আছে। তবে বাঙ্গার বক্তব্যে মূলত বৈশ্বিক চিত্র উঠে এসেছে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের হিসাব নয়।
বেসরকারি পুঁজি তিন গুণ হওয়ার তথ্য আশাব্যঞ্জক হলেও আসল প্রশ্ন, এই অর্থ কতটা বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ নিচ্ছে। এ বিষয়ে বক্তব্যে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। এখন নজর থাকবে ছয় উন্নয়ন ব্যাংকের যৌথ কাঠামো কত দ্রুত বাস্তবায়ন হয় এবং তা প্রকৃতপক্ষে তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ বাড়াতে পারে কি না, তার দিকে।

