আর্থিক অস্থিতিশীলতা, ঋণ কেলেঙ্কারি, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় দেশের ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকের আস্থা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে। আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদ—তিন সূচকেই প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ইসলামি ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণবিষয়ক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে আমানত বেড়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিপরীতে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।
একই সময়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ৫ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ইসলামি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ এক বছরে ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
দেশে বর্তমানে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে একত্র করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এ ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকগুলোও শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ৪৯টি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। পাশাপাশি ১২টি প্রচলিত ব্যাংক ৬৩২টি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংক শাখা ও উইন্ডো—দুই মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও দুর্বল পরিচালনব্যবস্থার কারণে ইসলামি ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা কমেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে দুটি ইসলামি ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা গ্রাহকের আস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, মূলত ২০২১ সাল থেকে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে ইসলামি ব্যাংকগুলোর ঋণপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। পরে বিভিন্ন অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির তথ্য সামনে আসতে থাকে।
তিনি জানান, কয়েকটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পর শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকের আস্থা কমতে থাকে। এর প্রভাবে আমানত বৃদ্ধির গতিও কমে যায়। ২০২৫ সালের আগস্টের পর সংকটের নানা তথ্য প্রকাশ্যে এলে আমানত ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এ খাতের ব্যাংকগুলোর রপ্তানি আয়-সংক্রান্ত প্রাপ্তি আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৭৩৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে এ সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৩০ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় মেটাতে অর্থ পরিশোধ বেড়েছে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কর্মীর সংখ্যা এক বছরে ৪৭ হাজার ৬৪১ থেকে কমে ৪৪ হাজার ৭৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কর্মী কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
সামগ্রিক সূচকে পিছিয়ে থাকলেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এ খাতের মোট আমানতের ৪৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ ইসলামি ব্যাংকগুলোর দখলে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোর হিস্যা ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এই অবস্থান ধরে রাখতে এজেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সেবার উন্নয়ন এবং গ্রাহকের আস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একত্র করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, শিগগিরই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকের আস্থা বাড়বে।

