রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়েছে। গত আগস্টে ব্যাংকগুলোর ডলার মজুত ছিল ৪১৩ কোটি ডলার, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৯ কোটি ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ছিল ৩৮৬ কোটি ডলার। সে তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মজুত বেশি রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর ডলার মজুত কমে ৩৫৭ কোটি ডলারে নেমেছিল, যা ২০১৮ সালের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন। এরপর এপ্রিলে তা বেড়ে ৪৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছায়। মে মাসে ছিল ৪৪৮ কোটি ডলার এবং জুনে কমে দাঁড়ায় ৩৮৭ কোটি ডলারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে রপ্তানি আয় বেড়ে ১ হাজার ৩০৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ২২৭ কোটি ডলার। রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রবাসী আয়ও ডলারের সরবরাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে ৮৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৫০ কোটি ডলার।
আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, বৈধ ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হারের ব্যবধান কমে আসা এবং তুলনামূলক বাজারভিত্তিক বিনিময় হারব্যবস্থাকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রবাসী আয় বাড়ায় টাকার ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা মিলেছে।
তবে ডলারের মজুত পুনরুদ্ধারের এই অগ্রগতি ধারাবাহিক নয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কেনার কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহে ওঠানামা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ১ হাজার ৮৮ কোটি ডলার। পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ৭ হাজার ১১৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ৪৩৬ কোটি ডলার।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি কিনেছে। এসব ডলার কেনা হয়েছে প্রতি ডলার ১২১ থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এসব কেনাকাটার উদ্দেশ্য।
তবে প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারে ডলার সরবরাহের সক্ষমতাও ধরে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেপ্টেম্বরে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং অক্টোবরে ২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করেছিল। পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়া ও ডলারের সরবরাহ উন্নত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বাজার থেকে ডলার কেনার দিকে যায়।
ব্যাংকারদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত ডলার বাজারে বিক্রি না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে আগ্রহী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগের পুনরুদ্ধারও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ বাড়লে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর অর্থনীতির ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতাও কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল, ষষ্ঠ সংস্করণ (বিপিএম৬) পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। প্রচলিত হিসাবপদ্ধতিতে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

