রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে, এমন গুঞ্জন ব্যাংক খাতে জোরালো হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ভেতরের যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। না হলে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে এমডি আনা হলে পদোন্নতির ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথও রুদ্ধ হতে পারে। তবে তাঁরা এ-ও স্পষ্ট করেছেন, কেবল বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হওয়ার কারণে কাউকে অযোগ্য ভাবা উচিত নয়। আবার ভেতরের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাও পাশ কাটানো যাবে না। তাঁদের মতে, নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
পরিষদের আহ্বায়ক মো. মোতাহের হোসেন বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগ উদ্বেগজনক।
জানা গেছে, এমডি নিয়োগের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে একাধিক তালিকা তৈরি হয়েছে। পরিষদের হাতেও ২৪ কর্মকর্তার একটি তালিকা আছে। সেই তালিকার কয়েকজন ইতিমধ্যে সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে আসা কর্মকর্তারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে পারেন। তবু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো, চাকরিবিধি, পদোন্নতি ও বদলি ব্যবস্থা, সরকারি নীতি বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁদের সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে পুরোনো ও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, আদালতে চলমান মামলা, জামানত আদায়, পুনঃতফসিল, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং গ্রামীণ ও কৃষিঋণ কার্যক্রম সামলাতে ব্যাংকের ভেতরের বাস্তবতা জানা জরুরি। তবে এসব চ্যালেঞ্জ বেসরকারি ব্যাংকের যেকোনো প্রার্থীর জন্য অনিবার্য, এমন দাবি পরিষদ করছে না। তাদের বক্তব্য, যোগ্যতা, সততা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বাস্তবতা বোঝার সামর্থ্য থাকলে বাইরের প্রার্থীরাও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ভেতরের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও যোগ্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নিয়োগ নিয়ে পরিষদের মূল দাবি ছয়টি। প্রথমত, নীতিমালার আলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের যোগ্য এএমডি ও ডিএমডিদের মূল্যায়ন করতে হবে। যোগ্য ভেতরের প্রার্থী থাকলে বাইরের প্রার্থী আনতে নীতিমালা বদলের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। শূন্য এমডি পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। ভেতরের ও বাইরের প্রার্থীদের জন্য অভিন্ন যোগ্যতার মানদণ্ড থাকতে হবে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পেশাগত মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে হবে। আর পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিষদের ভাষ্য, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে এএমডি ও ডিএমডি পদে পৌঁছানো কর্মকর্তাদের সামনে শীর্ষ নেতৃত্বের পথ খোলা না থাকলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াই দুর্বল হবে। তাই আগে ভেতরের যোগ্যদের মূল্যায়ন, প্রয়োজনে পরে বাইরের প্রার্থী বিবেচনার দাবি তাঁদের।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আছে। এ সময়ে নিয়োগের অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যাংকারদের এসব ব্যাংকের নেতৃত্বে আনার সুযোগ তৈরি করা। তবে শুধু একজন এমডি নিয়োগ করলেই দুর্বল ব্যাংকের অবস্থা বদলাবে না। ব্যাংক পরিচালনার সামগ্রিক পরিবেশও বদলাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, এ বিষয়ে গণমাধ্যম সূত্রে তাঁরা জেনেছেন। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে নীতিমালা পরিবর্তনসংক্রান্ত কোনো নথি তিনি পাননি। তাঁর মতে, এ ধরনের নিয়োগ নতুন নয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বার্থেই তা দেওয়া হতে পারে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ২০০৫-০৬ সালে সরকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদকে নিয়োগ দিয়েছিল, যিনি এখন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো গুঞ্জনের পর্যায়ে। সরকারি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নীতিমালা বদলের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড় করাতে দক্ষ নেতৃত্ব দরকার, আবার ভেতরের কর্মকর্তাদের মনোবল ধরে রাখাও জরুরি। এই দুইয়ের ভারসাম্য কীভাবে মেলানো হয়, সরকারের জন্য সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।

