অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তিগত ও আবাসন ঋণ নিজেদের হিসাবে নিয়ে আসার বিশেষ সুযোগ চালু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই সুবিধায় ঋণ স্থানান্তরকারী গ্রাহকেরা প্রথম এক বছর ৯ শতাংশ সুদ দেবেন। ঋণ স্থানান্তরের জন্য আলাদা কোনো খরচও দিতে হবে না। ফলে উচ্চ সুদের বোঝা বহন করা ঋণগ্রহীতাদের মাসিক কিস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, মূলত খুচরা ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। সুযোগটি থাকবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। আগ্রহী গ্রাহকেরা ব্যাংকের যেকোনো শাখায় গিয়ে অথবা ওয়েবসাইটে নিজের নাম ও পরিচয় দিয়ে আবেদন করতে পারবেন।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে ব্যক্তিগত ও আবাসন ঋণের সুদহার ৯ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। যাঁরা তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের জন্য ৯ শতাংশের এই প্রস্তাব বড় স্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ, সুদের হারে কয়েক শতাংশের পার্থক্যও দীর্ঘ মেয়াদে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থে বড় ফারাক তৈরি করে। বিশেষ করে আবাসন ঋণের মতো বড় অঙ্কের ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণে এর প্রভাব আরও বেশি পড়ে।
প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়েও ব্যাংকটি ধারণা দিয়েছে। ঋণ স্থানান্তরের মাধ্যমে গ্রাহকের বিদ্যমান ঋণের সমপরিমাণ অর্থ ব্র্যাক ব্যাংকে চলে আসবে। এর বাইরে প্রয়োজন হলে গ্রাহক অতিরিক্ত বা ‘টপ-আপ’ ঋণের জন্যও আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ পুরোনো দায় মেটানোর পাশাপাশি নতুন আর্থিক প্রয়োজনেও একই ব্যাংক থেকে সহায়তা নেওয়ার পথ খোলা থাকছে।
ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থানের কিছু তথ্যও পাওয়া গেছে। ব্র্যাক ব্যাংকে মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি বা খুচরা হিসাবের আমানত প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আমানতের তুলনায় খুচরা ঋণের এই অনুপাত দেখে ধারণা করা যায়, ব্যাংকটি এই খাতে ঋণ বিতরণের সুযোগ বাড়াতে চাইছে। অন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের নিজেদের দিকে টানার কৌশলও এর অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
ঋণ কেনার এই প্রতিযোগিতায় ব্র্যাক ব্যাংকই একমাত্র নয়। এর আগে ব্যাংক এশিয়া একই হারে, অর্থাৎ ৯ শতাংশ সুদে গাড়ি ও আবাসন ঋণ কেনার ঘোষণা দিয়েছে। প্রাইম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকও অন্য ব্যাংকের ঋণ কিনছে। ফলে খুচরা ঋণের বাজারে গ্রাহক ধরে রাখা ও নতুন গ্রাহক টানার প্রতিযোগিতা ক্রমে জোরালো হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় ঋণগ্রহীতারাই সরাসরি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সুদহার নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে ব্যাংকটি স্পষ্ট করেছে, ৯ শতাংশ হার শুধু প্রথম এক বছরের জন্য স্থির থাকবে। দ্বিতীয় বছর থেকে ঋণের ধরন অনুযায়ী সুদহার হবে পরিবর্তনশীল। তখন ব্যাংকের নির্ধারিত ভিত্তি হার বা ‘বেস রেট’-এর সঙ্গে ১ শতাংশ মার্জিন যোগ করে নতুন সুদহার ঠিক করা হবে। ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে প্রথম বছর শেষ হওয়ার পর প্রতি এক বছর অন্তর সুদহার পুনর্নির্ধারণ হবে। আর আবাসন ঋণের ক্ষেত্রে প্রথম বছরের পর প্রতি ছয় মাস অন্তর সুদহার বদলাবে।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। কোনো গ্রাহক চলতি বছরের নভেম্বরে ঋণ স্থানান্তর করলে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর সুদহার ৯ শতাংশেই থাকবে। ওই সময় যদি ব্যাংকের বেস রেট ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ হয়, তাহলে পরবর্তী মেয়াদে তাঁর ঋণের সুদহার দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ বেস রেটের সঙ্গে ১ শতাংশ মার্জিন যোগ হবে।
এই হিসাব থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, প্রথম বছরের পর সুদহার আর ৯ শতাংশে থাকবে না। তখন হার কত হবে, তা নির্ভর করবে বাজারের পরিস্থিতি ও ব্যাংকের বেস রেটের ওপর। বিশেষ করে আবাসন ঋণে ছয় মাস পরপর সুদহার বদলের সুযোগ থাকায় কিস্তির অঙ্কও কমবেশি হতে পারে। তাই শুধু প্রথম বছরের হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বর্তমান ঋণের সুদহার, বাকি মেয়াদ এবং স্থানান্তরের পর সম্ভাব্য মোট খরচ মিলিয়ে দেখাই গ্রাহকদের জন্য বিচক্ষণ হবে। স্থানান্তরে ফি না থাকলেও নতুন শর্তাবলি ভালোভাবে জেনে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর এই ঋণ কেনার প্রতিযোগিতা সুদহার কমিয়ে আনার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেসব গ্রাহক উচ্চ সুদের ঋণের চাপে আছেন, তাঁদের জন্য এটি কিস্তির বোঝা হালকা করার একটি বাস্তব সুযোগ। তবে সুযোগটি ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমিত থাকায় আগ্রহীদের হিসাব-নিকাশ করে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

