চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর-পরবর্তী নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসেই ব্যাংকটির একক হিসাবে লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৪১৪তম সভায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদন করা হয়। ওই বিবরণীতেই ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতির চিত্র উঠে এসেছে।
শেয়ারপ্রতি আয়েও বড় ধস
লোকসানের প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৫১ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৪৯ পয়সা।
সমন্বিত হিসাবে প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ টাকা ৪১ পয়সা। আর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১২ টাকা ২৭ পয়সা এবং সমন্বিত হিসাবে ১২ টাকা ২৪ পয়সা।
এক বছরে কমেছে নিট সম্পদমূল্য
ব্যাংকটির আর্থিক দুরবস্থার আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে নিট সম্পদমূল্যের হিসাবে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে একক হিসাবে ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্য ছিল ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকায়।
একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ৪৩ টাকা ২৫ পয়সা থেকে কমে ২২ টাকা ২৭ পয়সা হয়েছে। সমন্বিত হিসাবে এই মূল্য ৪৪ টাকা ৪৮ পয়সা থেকে নেমে এসেছে ২৩ টাকা ৬৪ পয়সায়।
এদিকে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সায় নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এই প্রবাহ ছিল ধনাত্মক ১১ টাকা ৮৯ পয়সা।
লোকসানের পেছনে যেসব কারণ
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুল লোকসানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা এবং বিনিয়োগ থেকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। পাশাপাশি আমানতকারীদের আমানতের বিপরীতে মুনাফা দেওয়ার ব্যয় বেড়ে যাওয়াও লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এস আলমের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর পুনর্গঠন
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিভিন্ন উপায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যাংকটি থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের বড় অংশ পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণে পরিণত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে ব্যাংকটির পরিচালনায় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির পুনর্গঠন ও পরিচালনার কাজ চলছে।
সব মিলিয়ে, বিপুল লোকসান, নিট সম্পদমূল্যের পতন এবং ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয়ের দুর্বলতা ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে চলমান পুনর্গঠন কার্যক্রম কতটা কার্যকর হয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

