জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাত মোকাবিলা এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব পথে পরিচালিত করতে সবুজ অর্থায়ন এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কৌশল। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার এই মহৎ উদ্যোগের আড়ালেই তৈরি হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি, যার নাম ‘গ্রিনওয়াশিং’।
পরিবেশের প্রকৃত উন্নতি না ঘটিয়েও কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিনিয়োগ, ঋণ, আর্থিক পণ্য কিংবা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করলে তাকে গ্রিনওয়াশিং বলা হয়। অর্থাৎ বাস্তব পরিবেশগত অর্জনের পরিবর্তে বিজ্ঞাপন, অসম্পূর্ণ তথ্য, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি এবং বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনের মাধ্যমে সবুজ ভাবমূর্তি তৈরিই এর মূল কৌশল।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও সবুজ অর্থায়নের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ব্যাংকগুলো একদিকে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলছে, অন্যদিকে তাদের অর্থায়নে পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশগত প্রভাব, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং প্রকল্পের প্রকৃত ফলাফল কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা নেই। ফলে সবুজ অর্থায়নের নামে কেবল পরিসংখ্যান ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি তৈরির প্রবণতা ভবিষ্যতে আর্থিক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি। গ্রিনওয়াশিং এখন আর শুধু পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুনাম, নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন সংস্থা রিপরিস্কের ৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত পঞ্চম বার্ষিক গ্রিনওয়াশিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৫৯৪টি প্রতিষ্ঠান গ্রিনওয়াশিং-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আর্থিক সেবা খাতে এ ধরনের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ শতাংশ এবং ব্যাংকের সংখ্যা ২৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে ৩০৫টি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ৮৬টি ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি এখন শুধু তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক শিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতেও পরিবেশগত দাবি এবং বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের নামে পরিচালিত প্রকল্পগুলোও যথাযথ যাচাইয়ের বাইরে থাকলে নতুন ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—রিপরিস্কের হিসাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম আসা মানেই আদালতে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়া নয়। এটি পরিবেশগত দাবি ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে সম্ভাব্য অসংগতির ঝুঁকি নির্দেশ করে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিষয়টি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
গ্রিনওয়াশিং কেন ব্যাংকগুলোর কাছে আকর্ষণীয়? ব্যাংকিং খাতে গ্রিনওয়াশিংয়ের পেছনে কয়েকটি অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কারণ কাজ করে। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন দেশে স্বল্পসুদের ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন, বিশেষ তহবিল এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও নির্দিষ্ট সবুজ খাতে পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ দিয়ে আসছে। ফলে প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই ছাড়া কোনো প্রকল্পকে সবুজ হিসেবে দেখানো হলে এসব সুবিধার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অবস্থায় ভালো পরিবেশগত ভাবমূর্তি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক সুনাম বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাস্তব অর্জনের চেয়ে ভালো পরিবেশগত অবস্থান তুলে ধরার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তৃতীয়ত, গ্রাহক আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশসচেতন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব আর্থিক পণ্য এবং দায়িত্বশীল ব্যাংকিং সেবার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। ব্যাংকগুলো এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সবুজ আমানত, পরিবেশবান্ধব ঋণ এবং টেকসই বিনিয়োগ পণ্য বাজারজাত করছে। কিন্তু এসব পণ্যের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, তা স্পষ্ট না হলে গ্রাহকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের সবুজ ব্যাংকিং: নীতিমালা থেকে বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে সবুজ ব্যাংকিং নীতিমালা প্রবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা, সবুজ বন্ড অর্থায়ন নীতিমালা এবং জলবায়ুসংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য প্রকাশের নির্দেশনা জারি করা হয়।
২০২০ সালে প্রবর্তিত টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার আওতায় সবুজ অর্থায়নের জন্য ৬৮টি পণ্য ও প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ২২ অক্টোবর নীতিমালাটি সংশোধন করে সবুজ অর্থায়নের পরিধি ১৪টি খাতে ৯৪টি পণ্য, প্রকল্প ও উদ্যোগ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট ঋণ বা বিনিয়োগের অন্তত ৫ শতাংশ সবুজ অর্থায়নে এবং ৪০ শতাংশ টেকসই অর্থায়নে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, ৫ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ দুটি পৃথক লক্ষ্যমাত্রা; এগুলো মোট মেয়াদি ঋণের ওপর নির্ধারিত নয়, বরং নিট ঋণ বা বিনিয়োগের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়।
এ ছাড়া সবুজ অর্থায়নের অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে এবং ২০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা খাতে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নির্ধারিত অর্থায়নের একটি অংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।
এসব উদ্যোগ দেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ইতিবাচক। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ যেন ব্যাংকগুলোকে কাগজে-কলমে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানোর দিকে ঠেলে না দেয়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালের নতুন নির্দেশনা: গ্রিনওয়াশিং ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ। সবুজ অর্থায়নের শ্রেণিবিন্যাস ও প্রতিবেদন প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স পলিসি ২০২৩ সংশোধনসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্কুলার জারি করে। সম্ভাব্য গ্রিনওয়াশিং প্রতিরোধ এবং নির্ভুল তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করাই ছিল এ নির্দেশনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
নতুন নির্দেশনায় কয়েকটি খাতের অর্থায়নকে সবুজ অর্থায়নের পরিবর্তে অন্যান্য টেকসই অর্থায়নের আওতায় প্রতিবেদনভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। যেমন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসংক্রান্ত অর্থায়নকে সরাসরি সবুজ অর্থায়ন হিসেবে না দেখিয়ে অন্যান্য টেকসই অর্থায়নের আওতায় নেওয়া হয়েছে। একইভাবে নিম্নমানের পরিবেশগত ও সামাজিক যথাযথ যাচাইসম্পন্ন সামুদ্রিক পরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব সরবরাহব্যবস্থার শর্ত পূরণ না করা নির্দিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্রডব্যান্ড উদ্যোগকে সবুজ অর্থায়নের তালিকা থেকে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রেও শ্রেণিবিন্যাসের শর্ত স্পষ্ট করা হয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল মাধ্যমে বিতরণ করা নির্দিষ্ট কিস্তিভিত্তিক ঋণকে, ভোক্তা অর্থায়ন বাদে, সবুজ অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সার্কুলারটি সব ধরনের ডিজিটাল ঋণকে সবুজ অর্থায়ন থেকে বাদ দেয়নি; বরং বিভিন্ন পণ্য ও প্রকল্পের শ্রেণিবিন্যাস নির্দিষ্ট করেছে।
এ নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—প্রযুক্তিনির্ভর বা সামাজিকভাবে উপকারী কোনো উদ্যোগ হলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব বলা যাবে না। প্রকল্পের প্রকৃতি, নির্ধারিত শর্ত এবং অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করেই অর্থায়নের শ্রেণি নির্ধারণ করতে হবে।
যেভাবে তৈরি হয় গ্রিনওয়াশিংয়ের ফাঁদ। ব্যাংকিং খাতে গ্রিনওয়াশিং সাধারণত কয়েকটি কৌশলে পরিচালিত হতে পারে।প্রথমত, আংশিক সত্যকে বড় করে প্রচার করা। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান সামান্য পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করল কিংবা একটি বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করল। ব্যাংক সেই প্রকল্পে অর্থায়ন করে প্রতিষ্ঠানটিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে প্রচার করল। কিন্তু কারখানাটির অধিকাংশ উৎপাদন যদি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হয় অথবা শোধনাগার নিয়মিত কার্যকর না থাকে, তাহলে শুধু একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের ভিত্তিতে পুরো প্রতিষ্ঠানকে সবুজ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিকে বর্তমান অর্জন হিসেবে দেখানো। কোনো ব্যাংক ২০৩০ বা ২০৪০ সালের মধ্যে নিট কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামানোর ঘোষণা দিতে পারে। কিন্তু ঘোষণার পাশাপাশি বর্তমান ঋণ পোর্টফোলিওতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা উচ্চ দূষণকারী শিল্পে অর্থায়নের পরিমাণ ও ঝুঁকি প্রকাশ না করলে সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তৃতীয়ত, সবুজ বন্ডের অর্থ ব্যবহারে অস্পষ্টতা। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থ নির্ধারিত প্রকল্পে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। নির্দিষ্ট প্রকল্পের পরিবর্তে অর্থ সাধারণ ব্যবসায়িক ব্যয়ে ব্যবহার করা হলে বন্ডটির সবুজ পরিচয় প্রশ্নের মুখে পড়বে।
চতুর্থত, সবুজ আমানতের নামে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। গ্রাহকদের পরিবেশবান্ধব আমানত প্রকল্পে অর্থ জমা দিতে উৎসাহিত করা হলেও সেই অর্থ কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে পরিবেশগত ফলাফল পরিমাপ করা হচ্ছে এবং প্রকল্পের স্বাধীন নিরীক্ষা হচ্ছে কি না, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন। এ ধরনের কৌশলের মূল সমস্যা হলো, অর্থায়নের ঘোষণা ও প্রকৃত পরিবেশগত অর্জনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া।
পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য বহুমুখী বিপদ। গ্রিনওয়াশিংয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি পরিবেশের ওপর পড়ে। প্রকৃত পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের পরিবর্তে কাগজে-কলমে সবুজ হিসেবে দেখানো প্রকল্পে অর্থ চলে গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের প্রভাব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একইভাবে ভবিষ্যতে পরিবেশগত বিধিনিষেধ কঠোর হলে পুরোনো প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ব্যাংক যদি এসব ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে অর্থায়ন করে, তাহলে খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়বে।
তৃতীয়ত, গ্রিনওয়াশিং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আঘাত করে। কেউ যদি পরিবেশবান্ধব উদ্দেশ্যে একটি আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করেন, অথচ পরে জানতে পারেন যে অর্থের ব্যবহার ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো সবুজ অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর তাঁর আস্থা কমতে পারে।
চতুর্থত, পুনঃঅর্থায়ন ও বিশেষ তহবিলের সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। প্রকৃত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপনের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থের প্রয়োজন থাকলেও বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, তথ্যপ্রকাশের সক্ষমতা এবং অর্থায়ন পাওয়ার সুবিধা তাদের তুলনায় বেশি হতে পারে। ফলে সবুজ অর্থায়নের সুবিধা প্রকৃত প্রয়োজনীয় খাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: ব্যাংকগুলোর পরিবেশগত দাবির জবাবদিহি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকগুলোর পরিবেশগত দাবি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নাগরিক সংগঠনের নজরদারির আওতায় আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর একটি আনুষ্ঠানিক গ্রিনওয়াশিং অভিযোগ দায়ের করা হয়। ফসিল ফ্রি সাউথ আফ্রিকা এবং স্টপ ইএএসিওপি জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগটি দেশটির বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ব্যাংকটি নিজেদের টেকসই অর্থায়ন ও জলবায়ু কার্যক্রমে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করলেও পূর্ব আফ্রিকার অপরিশোধিত তেল পরিবহন পাইপলাইন প্রকল্পে অর্থায়নের সঙ্গে তাদের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির অসংগতি রয়েছে। অভিযোগে ব্যাংকটির ২০২৫ সালের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিবেদন, জলবায়ুসংক্রান্ত আর্থিক তথ্য প্রকাশ এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের বক্তব্য পর্যালোচনার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে অভিযোগটি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অনিয়ম নয়; এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন একটি অভিযোগ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ব্যাংকট্র্যাকের ২৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক পর্যালোচনায় বিশ্বের ৩০টি বড় ব্যাংকের নীতি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৩০টির মধ্যে ২৬টি ব্যাংক এখনো বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রম সামঞ্জস্য করার অঙ্গীকার করেনি। ২৯টি ব্যাংকের প্রকৃতির ওপর অর্থায়নের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সময়সীমাবদ্ধ রূপান্তর পরিকল্পনাও নেই। এ প্রতিবেদন দেখায়, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও ব্যাংকগুলোর অর্থায়ননীতি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির দাবি করতে হলে এসব বিষয়কেও ব্যাংকের সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ইউরোপীয় ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষও ২০২৬ সালের ৩০ জুন খুচরা ব্যাংকিং পণ্যের জন্য পণ্য তদারকি ও পরিচালনা নির্দেশিকা সংশোধন করেছে। এতে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য প্রচারের ক্ষেত্রে গ্রিনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকাগুলো ২০২৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। এর আওতায় আর্থিক পণ্যের নকশা, গ্রাহক নির্বাচন, বাজারজাতকরণ এবং গ্রাহককে দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
গ্রিনওয়াশিং প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রিনওয়াশিং প্রতিরোধে প্রথমেই একটি সুস্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক সবুজ শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। কোন প্রকল্পকে পরিবেশবান্ধব বলা যাবে, তার জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশগত মানদণ্ড, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং যাচাইযোগ্য শর্ত থাকতে হবে। শুধু প্রকল্পের নাম বা উদ্যোক্তার দাবি দেখে সবুজ অর্থায়নের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিবেশগত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্যাংক কোনো প্রকল্পকে সবুজ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলে তার অর্থের ব্যবহার, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকিসম্পন্ন খাতে এ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোর তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বার্ষিক প্রতিবেদনে শুধু মোট সবুজ ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করলেই চলবে না। কোন খাতে কত অর্থ দেওয়া হয়েছে, অর্থের কতটুকু ব্যবহার হয়েছে, প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রের অবস্থা কী এবং বাস্তবে কতটুকু দূষণ কমেছে, সেসব তথ্যও প্রকাশ করতে হবে। চতুর্থত, সবুজ বন্ড ও আমানতের অর্থ ব্যবহারের জন্য পৃথক হিসাব এবং নিয়মিত নিরীক্ষা চালু করতে হবে। গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা যেন সহজেই জানতে পারেন তাঁদের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে, সে সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরও কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, প্রকল্পের পরিবেশগত ফলাফল যাচাই এবং ভুল তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাধারণ ঋণকে সবুজ ঋণ হিসেবে দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশোধিত প্রতিবেদন, আর্থিক জরিমানা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রত্যাহারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠত, সবুজ অর্থায়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরি সহায়তা, ঋণ নিশ্চয়তা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপনে বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে সবুজ অর্থায়নের সুবিধা শুধু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
সবুজ প্রচারণা নয়, প্রয়োজন বাস্তব অর্জন। সবুজ অর্থায়ন কোনো সাময়িক ব্যবসায়িক প্রবণতা কিংবা ব্যাংকের সুনাম বাড়ানোর বিজ্ঞাপনী কৌশল নয়। এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। অথচ এই উদ্যোগের আড়ালে যদি বিভ্রান্তিকর তথ্য, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি এবং পরিবেশগত অর্জনের কৃত্রিম হিসাব তৈরি হয়, তাহলে সবুজ অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১১ সালের সবুজ ব্যাংকিং নীতিমালা থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের টেকসই অর্থায়ন নীতিমালা এবং ২০২৬ সালের নতুন প্রতিবেদন নির্দেশনা—সব মিলিয়ে দেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এসব নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ব্যাংকগুলোর পরিবেশগত দাবি যেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় এবং অর্থায়নের প্রকৃত ফলাফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একটি ব্যাংক কত কোটি টাকা সবুজ অর্থায়নের ঘোষণা দিল, সেটি দিয়ে তার পরিবেশগত সাফল্য বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে, সেই অর্থায়নে কতটা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদিত হয়েছে, কতটা কার্বন নিঃসরণ কমেছে, কত পানি ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে এবং প্রকৃতিতে তার কী ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় সবুজ অর্থায়নের বিকল্প নেই। তবে পরিবেশের নামে আর্থিক সুবিধা অর্জন করে বাস্তবে পরিবেশের ক্ষতি অব্যাহত রাখার সুযোগও থাকা উচিত নয়। তাই ব্যাংকিং খাতে এখন সময় এসেছে প্রচারণানির্ভর সবুজ পরিচয়ের পরিবর্তে পরিমাপযোগ্য অর্জন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। কারণ প্রকৃত সবুজ অর্থনীতি গড়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের রঙে নয়, বরং দায়িত্বশীল বিনিয়োগ ও বাস্তব পরিবেশগত পরিবর্তনের ভিত্তিতে।

