অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের আটটি বেসরকারি ব্যাংক সর্বোচ্চ বা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণমান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের আমানত ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই আট ব্যাংকের মধ্যে ছয়টির ঋণমান ‘এএএ’ (ট্রিপল এ) এবং দুটির ‘এএ’ (ডাবল এ)। আমানতকারীদের আস্থা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে এই উচ্চ ঋণমানকে কাজে লাগাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
‘এএএ’ ঋণমান পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক, সিটি, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংক। ‘এএ’ ঋণমান নিয়ে তালিকায় আছে ট্রাস্ট ও ব্যাংক এশিয়া। এই তালিকায় যেমন ব্যাংক খাতের প্রথম প্রজন্মের প্রতিষ্ঠান আছে, তেমনি একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকও রয়েছে।
ঋণমান নির্ধারণের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসে ‘এএএ’ সর্বোচ্চ এবং ‘এএ’ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। স্বনামধন্য ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান থেকে এই দুই শ্রেণির মান পাওয়ার অর্থ, ওই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ঋণের গুণগত মান উচ্চ বিবেচিত হয় এবং ঋণঝুঁকি তুলনামূলক সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। রেটিং নির্ধারণে মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণমান, তারল্য পরিস্থিতি, আয় ও মুনাফা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, করপোরেট সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাসহ নানা সূচক পর্যালোচনা করা হয়।
ব্যাংক নির্বাহীরা জানান, বাংলাদেশে আমানত রাখার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ক্রেডিট রেটিংকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমানতকারীরা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন বা ঋণমান যাচাই না করেই সঞ্চয় জমা রাখতেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতের সংকট এবং কয়েকটি ব্যাংকের বিপর্যয় এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। এখন অর্থ রাখার সময় ক্রেডিট রেটিংয়ের পাশাপাশি করপোরেট সুশাসন, ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও সামগ্রিক ভাবমূর্তিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাহীদের মতে, অতীতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের মধ্য দিয়ে যেসব ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে, সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে। অন্যদিকে নিয়মনীতি মানা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমানত সংগ্রহ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সফল হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পথে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি ব্র্যাক ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর, এই নয় মাসেই আমানত বেড়েছে ১৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ৭৭ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। দেশের ব্যাংক খাতে গড় খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৩ শতাংশ। সেখানে ব্র্যাক ব্যাংক খেলাপি ঋণ ২ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ (সিআরএবি) থেকে ব্যাংকটি দীর্ঘমেয়াদি রেটিংয়ে সর্বোচ্চ মান ‘এএএ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-১’ পেয়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, দেশের ব্যাংক খাত যখন খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত এবং অর্থনীতি নানা সংকটে জর্জরিত, তখন ব্র্যাক ব্যাংক সাফল্যের শিখরে অবস্থান করছে। গত আড়াই দশকে গড়ে ওঠা ব্র্যান্ড ভ্যালু, উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ও আস্থার প্রতিদান তাঁরা পাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, ব্যাংক আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠান, যা রাতারাতি তৈরি হয় না। এর জন্য দীর্ঘ শ্রম ও সাধনা লাগে। তিনি দাবি করেন, ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধিতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
সিআরএবি থেকে ব্র্যাকের মতোই ‘এএএ’ ও ‘এসটি-১’ রেটিং পেয়েছে সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংক। ট্রাস্ট ব্যাংক পেয়েছে ‘এএ১’। এই পাঁচ ব্যাংকেরই আমানত এখন ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেপ্টেম্বর শেষে সিটি ব্যাংকের আমানত ছিল ৭৭ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ডাচ্-বাংলায় ছিল ৭৩ হাজার ২৮২ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৬৩ হাজার ৩০ কোটি এবং ট্রাস্ট ব্যাংকে ৫৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী জানান, আগে গ্রাহকেরা আমানত রাখতে ক্রেডিট রেটিংয়ের খবর নিতেন না। এখন নিচ্ছেন, কারণ কিছু ব্যাংকে অর্থ রেখে গ্রাহকেরা প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। করপোরেট সুশাসন মানা ও ভাবমূর্তি ধরে রাখার ফল এখন তাঁরা পাচ্ছেন। চলতি বছরের নয় মাসে ট্রাস্ট ব্যাংকের আমানত প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
‘এএএ’ রেটিংপ্রাপ্ত প্রাইম ব্যাংক চলতি অক্টোবরে ৫০ হাজার কোটি টাকার আমানত স্থিতি ছুঁয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকের আমানত ছিল ৪৪ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন, প্রাইম ব্যাংকের সব সূচকই স্থিতিশীল ও টেকসই। চাইলে অনেক আগেই আমানত অর্ধ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারত। তবে তাঁরা টেকসই ও গুণগত প্রবৃদ্ধিকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ঋণমান প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরআইএসএল) থেকে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ রেটিং পেয়েছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। সরকারি খাত থেকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া এই ব্যাংকের আমানত এখন ১ লাখ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। দুই দশক আগেও সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত থাকা ব্যাংকটি এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি। গত ডিসেম্বর শেষে এর আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নয় মাসে আমানত ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে।
একই রেটিং প্রতিষ্ঠান থেকে ‘এএ+’ রেটিং পেয়েছে ব্যাংক এশিয়া। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের মানসিকতা স্পষ্টভাবে বদলাচ্ছে। এখন শুধু সুদ বা পরিচিতি নয়, সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতাই আস্থার মূল মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা টিকে থাকলে সুশাসনে এগিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোর হাতেই আমানতের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো হারানো আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনে।

