দেশের ব্যাংক খাতে নগদ অর্থের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদের হার কমেছে। গত সেপ্টেম্বরে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে অর্থ ধার নেওয়ার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে কলমানি ও পুনঃক্রয় চুক্তির বাজারে সুদের হার মাসের শেষ দিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে কলমানি বাজারে ভারিত গড় সুদের হার ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। মাসের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ এক মাসের মধ্যে আন্তব্যাংক স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পুরো সেপ্টেম্বর মাসে কলমানি বাজারের গড় সুদের হার ছিল ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর আগে জুলাইয়ে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে গড় সুদের হার কমেছে ১ দশমিক ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন নগদ অর্থের চাহিদা পূরণে কলমানি বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাজারে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে সাধারণত এক দিনের জন্য অর্থ ধার নেয়। কোনো ব্যাংকের সাময়িক অর্থসংকট দেখা দিলে তারা অন্য ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহার করে প্রয়োজন মেটাতে পারে।
তবে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকলে স্বল্পমেয়াদি ঋণের চাহিদা কমে যায়। ফলে আন্তব্যাংক বাজারে সুদের ওপর চাপ কমে এবং ঋণ গ্রহণের খরচও হ্রাস পায়। সেপ্টেম্বরে কলমানি বাজারের সুদহার কমে যাওয়াকে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু কলমানি বাজারেই নয়, পুনঃক্রয় চুক্তির মাধ্যমেও ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের খরচ কমেছে। এই ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ডের মতো আর্থিক সম্পদ সাময়িকভাবে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী সেই সম্পদ আবার কিনে নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে পুনঃক্রয় চুক্তির বাজারে ভারিত গড় সুদের হার ৯৭ ভিত্তি পয়েন্ট কমেছে। মাসটিতে এই বাজারের গড় সুদের হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর আগে জুলাইয়ে এই হার ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে পুনঃক্রয় চুক্তির গড় সুদের হার প্রায় ১ দশমিক ০৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের খরচ আগের বছরের তুলনায়ও কিছুটা কমেছে।
এদিকে ব্যাংকগুলোর অর্থ ধার নেওয়ার মেয়াদেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে এক দিনের জন্য অর্থ ধার নেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন তুলনামূলক দীর্ঘ মেয়াদে অর্থ সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সাত দিন মেয়াদি ঋণ লেনদেনের অংশ বেড়ে মোট লেনদেনের প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ গত মে মাসে এই ধরনের লেনদেনের অংশ ছিল মাত্র ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
অন্যদিকে এক দিন মেয়াদি ঋণ লেনদেনের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশে। ফলে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাত দিন মেয়াদি ঋণ এখন এক দিন মেয়াদি ঋণের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের মেয়াদে এই পরিবর্তন মুদ্রাবাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্বল্প সময়ের জন্য বারবার অর্থ সংগ্রহের পরিবর্তে কিছুটা বেশি মেয়াদে অর্থ ধার নেওয়ার প্রবণতা ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাধারণত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নগদ অর্থের সংকট বেড়ে গেলে আন্তব্যাংক বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়ে। তখন ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে বাধ্য হয়। বিপরীতে তারল্য পরিস্থিতি সহজ হলে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে এবং সুদহারও নিম্নমুখী হয়।
সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে কলমানি ও পুনঃক্রয় চুক্তি—উভয় বাজারে সুদহার কমার প্রবণতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে সাত দিন মেয়াদি লেনদেনের অংশ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে।
তবে আন্তব্যাংক বাজারে সুদের হার কমার অর্থ এই নয় যে সাধারণ গ্রাহক বা ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণের সুদও একই হারে কমে যাবে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদ নির্ভর করে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয়, ঋণঝুঁকি, পরিচালন ব্যয় এবং সামগ্রিক মুদ্রানীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
তবু স্বল্পমেয়াদি মুদ্রাবাজারে ঋণের খরচ কমে আসা ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিবাচক সংকেত। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের চাহিদা মেটানোর চাপ কিছুটা কমেছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মুদ্রাবাজারে তারল্য পরিস্থিতি তুলনামূলক সহজ হয়েছে। কলমানি ও পুনঃক্রয় চুক্তির বাজারে সুদের হার কমার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের মেয়াদেও পরিবর্তন এসেছে। তবে এই স্বস্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থের চাহিদা, আমানত প্রবাহ এবং সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর।

