বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলন করায় তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাদের এ নোটিশ দেওয়া হয়।
নোটিশ পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন— নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।
তাদের ১০ দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর নীতিমালা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক কর্মদিবস পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে এই তিন কর্মকর্তা গভর্নরের একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেন। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, তুলনামূলক কম দুর্বল এক্সিম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ এর আওতায় ইতোমধ্যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সরকারি মালিকানায় একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন। তাদের দাবি ছিল, বিকাশকে দ্রুত লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ওই দিন পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সসহ আটটি এজেন্ডা ছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকেও জানানো হয়, শুধু বিকাশকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বৈঠক ডাকা হয়েছে—এটি সঠিক নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে তোলার সুযোগ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের দিন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কয়েকটি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনের পর একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। পরিচালনা পর্ষদের আলোচনার বিষয় প্রকাশ্যে আনা শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাতে ‘খেয়ালি বক্তব্য’ বন্ধ করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে।
এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চান, কোনো ব্যক্তির নয়। তার ভাষায়, “স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে কথা না বললেও এখন চুপ থাকলে ভবিষ্যতে আবার প্রশ্ন উঠবে। নওশাদ মোস্তফা বলেন, “৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলা হতাম না।”
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে একটি ঐক্য গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন প্যানেলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ ঐক্য গড়ে উঠছে।
এই জোটের সমন্বয়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরীকে। তবে ১৬ ফেব্রুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনে তাকে উপস্থিত দেখা যায়নি।

