সরকার সরাসরি টাকা ছাপায় না। এই কাজটি করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সরকার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন কার্যত নতুন অর্থ তৈরি হয়, যাকে সাধারণভাবে “টাকা ছাপিয়ে ঋণ” বলা হয়।
প্রক্রিয়াটি শুরু হয় সরকারের বাজেট ঘাটতি থেকে। আয় কমে গেলে এবং কর রাজস্ব দিয়ে ব্যয় মেটানো সম্ভব না হলে সরকার প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেয়। কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত অর্থ না পেলে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের হিসাবে নতুন অর্থ যোগ করে। এই অর্থ কখনো কাগজের নোট ছাপার মাধ্যমে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিজিটাল এন্ট্রির মাধ্যমে তৈরি হয়। অর্থাৎ সরকারের অ্যাকাউন্টে সরাসরি নতুন টাকা যুক্ত হয়, যা আগে অর্থনীতিতে ছিল না।
এই নতুন তৈরি অর্থকে অর্থনীতিতে “উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ” হিসেবে ধরা হয়। কারণ এই টাকা যখন সরকারি ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়—যেমন বেতন, ভর্তুকি বা উন্নয়ন প্রকল্পের বিল—তখন তা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে যায় এবং পুরো অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।
সরকার স্বল্পমেয়াদে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স বা ওভারড্রাফট সুবিধার মাধ্যমেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল বা বন্ড কিনে সরকারের ঘাটতি পূরণ করে, যা একইভাবে নতুন অর্থ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত।
এই পুরো ব্যবস্থার ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়। আর অতিরিক্ত টাকা বাজারে প্রবেশ করলে পণ্যের চাহিদার তুলনায় অর্থের পরিমাণ বেশি হয়ে যায়, যার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। তবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় সরকারকে বারবার ঘাটতি পূরণে ঋণের দিকে যেতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের অর্থায়ন স্বল্পমেয়াদে সরকারকে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন রাজস্ব আয় দুর্বল থাকে এবং ব্যয় স্থায়ীভাবে বেশি হয়, তখন এই চাপ আরও বাড়ে। সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার এই প্রক্রিয়াই কার্যত “নতুন টাকা সৃষ্টি” হিসেবে কাজ করে, যা অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং নীতিনির্ধারণে সতর্ক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন করে।

