দেশে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফেরায় শিল্প খাতে বিনিয়োগের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ডলার সরবরাহ সহজ হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের গতি নিয়ে মিশ্র চিত্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতে প্রায় ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তবে এলসি খোলার বিপরীতে নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উল্টো প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আগের অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যেখানে ১২৭ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরে তা কমে ১১১ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এতে প্রায় ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এলসি খোলা বাড়া ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পূর্বাভাস দিলেও নিষ্পত্তি কমে যাওয়া বর্তমান অর্থনৈতিক ধীরগতির প্রতিফলন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এলসি খোলার পর তা বাস্তবায়নে সময় লাগে, তাই এই পার্থক্যকে স্বাভাবিক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে তেমন ইতিবাচক চিত্র নেই। এই খাতে এলসি খোলা কমেছে ২ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ২ দশমিক ০৬ শতাংশ। এটি উৎপাদন খাতে চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে এলসি খোলা বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তবে নিষ্পত্তি সামান্য কমেছে, যা বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে একটি সাময়িক ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত হতে পারে।
জ্বালানি খাতে পরিস্থিতি আরও চাপের। এই খাতে এলসি খোলা কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারে দামের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে। উচ্চ সুদের হার, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এতে স্পষ্ট। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনের পর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা তৈরি হয়েছে, তবুও বাস্তব বিনিয়োগ এখনো তেমন বাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। এতে আমদানি প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে এলসি খোলার এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। সব মিলিয়ে, এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো সতর্কতার বার্তাই বেশি জোরালো।

