দেশের বিভিন্ন শিল্প খাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার এবং নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্প ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সরকার ব্যবসায়ী সমাজের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলেও জানান তিনি।
গতকাল বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। পুরো সভা পরিচালনা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এফবিসিসিআই প্রশাসক আবদুর রহিম খান। সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নিয়ে মতামত দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সঠিক নীতি, আধুনিক সুবিধা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের স্বর্ণ ব্যবসা খাতকে একটি বড় রপ্তানি খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি জানান, এই খাতের বড় অংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে। এটিকে দৃশ্যমান ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই খাত থেকে বছরে ১২ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার প্রতিকূল সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যেই এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করা এখন অত্যন্ত জরুরি, যা শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়, বরং জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গেও যুক্ত।
বর্তমানে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন শিল্প সংকটে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং লজিস্টিক জটিলতা—এসব সমস্যা সমাধান ছাড়া শিল্পখাতকে পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কর দেওয়ার বিনিময়ে কিছু পাওয়া যায় না—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সেবা কর রাজস্ব দিয়েই পরিচালিত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রস্তাব দেওয়ার সময় শুধু নিজ খাতের সুবিধা নয়, জাতীয় স্বার্থকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। খাতভিত্তিক স্বস্তি এবং জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধির মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
তিনি আরও জানান, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিক খাতেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে বেসরকারি খাত থেকে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা প্রত্যাশা করছে সরকার।
এদিকে সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান আগামী বাজেটে একাধিক প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ, করপোরেট কর হ্রাস, আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর ধাপে ধাপে কমানো, উৎসে কর কর্তনের হার যৌক্তিকীকরণ এবং যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর উৎসে কর কমানো।
তিনি আরও প্রস্তাব দেন, টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর ধাপে ধাপে শূন্যে নামিয়ে আনা, স্থানীয় পর্যায়ে পণ্যের সরবরাহে মূসকের হার ২ শতাংশ নির্ধারণ এবং শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) এবং মাঝারি করদাতা ইউনিট (এমটিইউ) স্থাপনের প্রস্তাবও দেন তিনি। পাশাপাশি করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ, অটোমেশন ও নেট সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর জাল বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রপ্তানি উন্নয়নের জন্য ইডিএফ (রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল) এর পরিমাণ বাড়ানো এবং সব রপ্তানি খাতের জন্য এটি উন্মুক্ত করার প্রস্তাবও সভায় তুলে ধরা হয়।

