রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিএইআরএ) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেছেন, আপাতত বড় কোনো ঝুঁকি না থাকলেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় গ্রিড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রটির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএইআরএ। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এর মাধ্যমে গ্রিডের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতাও পরীক্ষা করা হবে।
তার ভাষায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিড ব্যবস্থাপনা সাধারণ কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নয়। এখানে বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি ৫০ হার্জের মধ্যে স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য ওঠানামাও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমনকি নির্ধারিত সীমার নিচে ফ্রিকোয়েন্সি নেমে গেলে প্ল্যান্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি, ভোল্টেজ এবং লোড—সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। শুরুতে সীমিত উৎপাদনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতার দিকে এগোনো হবে।
গ্রিড ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএইআরএর চেয়ারম্যান। তিনি জানান, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নিজেও বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তা তদারকির অংশ হিসেবে রূপপুর প্রকল্পে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালানো হবে। প্রতি পাঁচ দিন পরপর বিশেষজ্ঞ দল কেন্দ্রটি পরিদর্শন করবে। রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম, বোরিক অ্যাসিডের মাত্রা, রেডিয়েশন পরিস্থিতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিতভাবে পরীক্ষা ও নথিভুক্ত করা হবে।
মাহমুদুল হাসান বলেন, পুরো কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই কেন্দ্রটির নিরাপদ ও কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রূপপুর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর আশা, আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারির মধ্যে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে। প্রাথমিকভাবে ইউনিটটি থেকে ৯০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তীতে পূর্ণ সক্ষমতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সামনে জনবল সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। বিএইআরএর চেয়ারম্যান স্বীকার করেন, সংস্থাটির প্রায় অর্ধেক পদ এখনও খালি রয়েছে। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় দ্রুত জনবল সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হচ্ছে।
তিনি জানান, দক্ষ জনবল তৈরির জন্য অনেককে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরেছেন। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
দ্বিতীয় ইউনিট নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। প্রথম ইউনিটের মতো পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করে সেটিও চালু করা হবে। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের সম্ভাব্য তারিখ আগে নির্ধারণ করা হলেও তখন সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। বিশেষ করে ফায়ার সেফটির কিছু ঘাটতি ছিল। পরে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ এবং মান যাচাই শেষে লাইসেন্স দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোর যাচাই-বাছাই করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি ইউনিটের জন্য আলাদা অপারেশনাল লাইসেন্স প্রয়োজন। সব ধরনের নিরাপত্তা ও কারিগরি যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, একই এলাকায় আরও ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে ছোট আকারের, যেমন ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিটও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তবে এসব সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে। ভবিষ্যতে ভিন্ন প্রযুক্তি বা অন্য দেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রয়েছে।

