দেশের বড় শহরগুলোতে প্রতিদিনের যানজট এখন নাগরিক জীবনের বড় ভোগান্তির নাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকার ক্লান্তি থেকে মুক্তি খুঁজতে অনেকেই ঝুঁকছেন বাইসাইকেলের দিকে। সহজ যাতায়াত, কম খরচ ও স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই বাহন। তরুণদের পাশাপাশি মধ্যবয়সীরাও এখন নিয়মিত সাইকেল চালাচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে সাইকেল ব্যবহার করছেন। অফিসগামীদের মধ্যেও বাড়ছে এর ব্যবহার।
শুধু ব্যক্তিগত যাতায়াত নয়, ডেলিভারি পেশাতেও এখন বাইসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে। অনলাইনভিত্তিক পণ্য সরবরাহে যুক্ত অনেক কর্মী দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে সাইকেল ব্যবহার করছেন। ফলে দেশে বাইসাইকেলের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। গত এক বছরেই দেশে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বাইসাইকেল বিক্রি হয়েছে।
একসময় দেশের বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডের আধিপত্য থাকলেও এখন দৃশ্যপট বদলেছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাইকেল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের বাজারের অর্ধেকের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান—মেঘনা গ্রুপ, আরএফএল ও আকিজ ভেঞ্চার।
বাইসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই তিন প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি ছিল প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সেই বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাজার বেড়েছে ১৫০ কোটিরও বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার সাইকেল বিক্রি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়েই সবচেয়ে বেশি সাইকেল বিক্রি হয়। বছরের মোট বিক্রির অর্ধেকের বেশি এই কয়েক মাসেই সম্পন্ন হয়। মোট বিক্রির প্রায় ৫০ শতাংশ শিশুদের সাইকেল। বাকি অংশের বড় ক্রেতা ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা। তবে নারী ব্যবহারকারীর অংশ এখনো ১০ শতাংশের নিচে।
দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি বাইসাইকেল। গত দুই বছরে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিক্রি প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করছে মেঘনা গ্রুপ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই রপ্তানি করেছে মেঘনা গ্রুপ।
একই সময়ে আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ১ কোটি ১৮ লাখ ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি করে। সেই অর্থবছরে বাইসাইকেল রপ্তানিতে প্রতিষ্ঠানটি ছিল চতুর্থ অবস্থানে। অন্যদিকে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো রপ্তানির তালিকায় যুক্ত হয়েছে আকিজ বাইসাইকেল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। গত ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি নেদারল্যান্ডসে প্রায় দুই কোটি টাকার বাইসাইকেল রপ্তানি করে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাইসাইকেল ও এর যন্ত্রাংশ মিলিয়ে বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ যন্ত্রাংশের বাজার এবং বাকি ৭০ শতাংশ সম্পূর্ণ বাইসাইকেল। বর্তমানে এই বাজারের অর্ধেকের বেশি অংশ দখল করে আছে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী কয়েক বছরে স্থানীয় ব্র্যান্ডের অংশীদারিত্ব আরও ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
দেশের সবচেয়ে বড় বাইসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এখন মেঘনা গ্রুপ। ১৯৭৬ সালে তেজগাঁওয়ের একটি সাইকেল কারখানা কিনে যাত্রা শুরু করেন আবদুল খালেক। পরে সেটির নামকরণ করা হয় মেঘনা সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৮৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বড় ছেলে মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ব্যবসার দায়িত্ব নেন এবং প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ ঘটান।
বর্তমানে মেঘনা গ্রুপের অধীনে সাইকেল তৈরির জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সাতটি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে মাহিন সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ দেশের বাজারের জন্য সাইকেল তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি ভেলোস, সেভেন্টি ওয়ান, প্রিন্স ও রিফ্লেক্স ব্র্যান্ডের সাইকেল উৎপাদন করছে। শুধু এই কারখানারই প্রতিদিন এক হাজারের বেশি সাইকেল তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তারা দেড় লাখের বেশি সাইকেল বিক্রি করেছে। দেশে তাদের বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ১৫০ কোটি টাকার বেশি।
মেঘনা গ্রুপের বাইক ডিভিশনের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. মহসিনুল ইসলাম বলেন, দেশে সাইকেলের বাজার বড় হওয়ার পেছনে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিই প্রধান কারণ। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবছর তাদের বিক্রি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। সাইকেলের বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে।
দেশে বাইসাইকেল উৎপাদনের আরেক বড় নাম আরএফএল। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ ও রংপুরের গঙ্গাচড়ায় প্রতিষ্ঠানটির দুটি বড় কারখানা রয়েছে। বছরে প্রায় আট লাখ সাইকেল তৈরির সক্ষমতা রয়েছে এসব কারখানায়। উৎপাদন ও বিপণনে কাজ করছেন প্রায় তিন হাজার কর্মী। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যে সাইকেল রপ্তানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে আরএফএল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসসহ ১৮টি দেশে তারা বাইসাইকেল রপ্তানি করছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আগে বাইসাইকেলের বাজারে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশ। এখন তা প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, জ্বালানিসংকট ও নগরজীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতা সাইকেলের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
২০২৩ সালের মে মাসে বাইসাইকেল উৎপাদনে আসে আকিজ ভেঞ্চারের প্রতিষ্ঠান আকিজ বাইসাইকেল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ১৪ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে তাদের কারখানা। এতে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কারখানাটিতে প্রতি মাসে প্রায় ৪২ হাজার সাইকেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এখানে প্রায় ৮০০ কর্মী কাজ করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তারা প্রায় ৪০ হাজার সাইকেল বিক্রি করেছিল। পরের অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৯৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে দুই লাখ সাইকেল বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আকিজ বাইসাইকেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জয়নুল আবেদিন বলেন, এক দশক আগে দেশের বাজারে প্রায় ৯০ শতাংশ সাইকেল আমদানিনির্ভর ছিল। এখন দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোই বাজারের অর্ধেকের বেশি দখল করে নিয়েছে।

