যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে অর্থনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি থেকে প্রত্যাশিত লাভের তুলনায় বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ, নীতি-স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা অনেক বেশি হতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সম্প্রসারণ ও কৌশলগত সুবিধা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ছিল প্রশাসনিক কাঠামো। পরে সরকার পরিবর্তনের পরও এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কারণ, দুই পক্ষের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার লিখিত স্বীকৃতি এবং নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরই এটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয় বাড়াতে হবে। এর মধ্যে বিমান, জ্বালানি, কৃষিপণ্য এবং সামরিক সরঞ্জাম উল্লেখযোগ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পণ্য সাধারণত বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে অন্য দেশ থেকে সংগ্রহ করে থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলকভাবে বেশি দামে কেনাকাটা করলে দেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ গম ও সয়াবিন আমদানি করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অঙ্গীকার রয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভর্তুকি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।
বিমান খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একাধিক উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই চুক্তিকে অনেকেই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক চাপের ফলাফল হিসেবে দেখছেন। অতীতে ইউরোপীয় একটি কোম্পানি থেকে বিমান কেনার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন হয়।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুল্কনীতি। এতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের ওপর মোট শুল্কভার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, সেখানে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বহু পণ্যে শুল্ক হ্রাস বা শূন্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক কাঠামোতে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পও প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারে।
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হিসেবে উঠে এসেছে নীতিগত শর্তাবলি। এতে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল বাণিজ্য, জ্বালানি আমদানি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি পরিবর্তনের শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। এতে ছোট কৃষক ও ওষুধ শিল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদে চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে স্থানীয় উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে এবং স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
চুক্তিটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মত দিয়েছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তাদের মতে, সব দেশের জন্য সমান বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করার যে মূলনীতি রয়েছে, এই চুক্তিতে তা ব্যাহত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক কমালেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক বাড়তে পারে। এতে দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নীতি নির্ধারণে স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া। জ্বালানি, পারমাণবিক প্রযুক্তি, এমনকি অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিবেচনায় নিতে হতে পারে, যা একটি স্বাধীন বাণিজ্যনীতির জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে এই চুক্তিকে কেউ কেউ কৌশলগত বাণিজ্য অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখলেও অনেকেই একে অসম কাঠামো হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য আর্থিক চাপ ও নীতি-স্বাধীনতার সংকোচন তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদ্যমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংলাপ কাঠামোকে আরও সক্রিয় করে পুনরায় আলোচনার সুযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

