দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে আলোচিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি ছিল পায়রা বন্দর। এই সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের সামনে দেখানো হয়েছিল কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বড় স্বপ্ন। সেই আশায় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ প্রায় সাত হাজার একর কৃষিজমি বন্দরের জন্য ছেড়ে দেন।
২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এক দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও বন্দরের প্রথম টার্মিনালে যাওয়ার সড়ক ও সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এদিকে বন্দরের মূল চ্যানেল সচল রাখতে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ড্রেজিং প্রকল্প নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে।
রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার নিশ্চিত করা, যাতে গভীর সমুদ্রগামী বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত দুই বছরে বন্দরে কোনো মাদার ভেসেল সরাসরি প্রবেশ করেনি। বর্তমানে চ্যানেলের বিভিন্ন অংশে নাব্য ৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ মিটারে নেমে এসেছে। ফলে বড় জাহাজ চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পায়রা বন্দর সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ১৯ মার্চ ‘ডেজার্ট ভিক্টোরি’ নামে একটি কয়লাবাহী মাদার ভেসেল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরে সেখানে থেকে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হয়। অর্থাৎ পায়রায় সরাসরি বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটি মূলত রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের একটি উদাহরণে পরিণত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার কার্যকর সুফল মিলছে না। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একটি সিন্ডিকেট এই প্রকল্প থেকে সুবিধা নিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে যদি নিজস্ব ড্রেজার কেনা হতো, তাহলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্য ধরে রাখা সহজ হতে পারত।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট টার্মিনাল পর্যন্ত ছয় লেন সড়কের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া আন্ধারমানিক নদীর ওপর নির্মাণাধীন চার লেন সেতুর প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে স্থলপথে সরাসরি পণ্য খালাস কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে এবং শেষ হয় ২০২৩ সালে। বেলজিয়ামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান-ডি-লুন এই কাজ বাস্তবায়ন করে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দ্রুত পলি জমে চ্যানেলের গভীরতা কমে যায়। এতে পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পায়রা বন্দরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চ্যানেলের গড় নাব্য ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছে। জোয়ারের সময় কিছুটা গভীরতা বাড়লেও ভাটায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে। ফলে নির্ধারিত গভীরতার বেশি ড্রাফটের জাহাজ চ্যানেলে প্রবেশ করতে পারে না।
লালুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস বলেন, ২০২১ সালে নেওয়া ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তার ভাষায়, “এটি ছিল এক ধরনের গোয়ার্তুমি। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থ জলে গেছে।” পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চল থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার পলি এসে এই চ্যানেলে জমা হয়। ফলে নাব্য ধরে রাখা একটি বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
জাহাজের চালকদের মতে, ছোট কার্গো জাহাজ চলাচলের জন্যও অন্তত ৮ দশমিক ৭ মিটার গভীরতা প্রয়োজন। আর বড় মাদার ভেসেলের জন্য দরকার ১২ মিটারের বেশি নাব্য। সেখানে বর্তমান গভীরতা সেই মানের অনেক নিচে অবস্থান করছে। ফলে বন্দরের কোনো জেটিতেই বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারছে না। স্থানীয় জেলে আফসার আলী বলেন, এটি অত্যন্ত পলিবাহী নদী এলাকা। নিয়মিত খনন না করলে দ্রুত চর জেগে ওঠে এবং নৌপথ অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’–এর সদস্যসচিব ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকা থেকে আসা বিপুল পলি দ্রুত রাবনাবাদ চ্যানেল ভরাট করে ফেলছে। তার মতে, এই বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর ও ভারী শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ফলে এখন বড় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে সরকার নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ঘনমিটার খননের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্য ৯ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজস্ব ড্রেজার কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

