আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের চামড়াশিল্পে দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতি বছর কোরবানির পর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সংরক্ষণ সংকট এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা রোধে এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থাপনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
চামড়া শিল্পকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নীতিসহায়তা দিয়েছে। গত ৫ মে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, চামড়া ব্যবসায়ীরা এখন থেকে আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।
এ সিদ্ধান্ত কোরবানির সময় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এই সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
চলতি মূলধন ঋণ দ্রুত অনুমোদন ও বিতরণের জন্য দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র চামড়া সংগ্রাহকদের ওপর। এ নির্দেশনার মাধ্যমে বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল ও হাটবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ঋণ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যা কোনোভাবেই আগের বছরের তুলনায় কম হতে পারবে না। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চামড়া শিল্প পুনরুদ্ধারে একাধিক পরিকল্পনা ও প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ৬ মে এক বক্তব্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চামড়ার বাজারকে শক্তিশালী করতে হবে এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, কোরবানির চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই ইতিবাচক ফল আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে সরকার মাদরাসা ও এতিমখানার অনুকূলে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে মূলত লবণ কিনে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। জেলা প্রশাসকেরা ঈদের আগেই নিজ নিজ জেলার মাদরাসা ও এতিমখানায় লবণ পৌঁছে দেবেন। একই সঙ্গে পশু জবাই ও চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ৪ মে এই বরাদ্দ অনুমোদন করে। শর্ত অনুযায়ী, লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমেই পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া দীর্ঘদিন ভালো রাখতে এবং পচন রোধে সঠিক পরিমাণ লবণ ব্যবহার অপরিহার্য। যথাযথভাবে লবণ না দেওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। বিসিক ও ট্যানারি মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি বা বড় গরুর চামড়া সংরক্ষণে ৭ থেকে ৮ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়, কখনো তা ১০ কেজি পর্যন্তও লাগে। ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার ক্ষেত্রে লাগে ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের কোরবানিতে দেশে মোট ৯১ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল। এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৪৭ লাখের বেশি এবং ছাগল-ভেড়া ছিল ৪৪ লাখের বেশি। চলতি বছরে কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক সংরক্ষণ না থাকায় প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। শুধু ২০২৫ সালের কোরবানির প্রথম দুই দিনেই প্রায় পাঁচ লাখ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়েছিল বলে জানিয়েছে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন।
চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে কিছু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা। একটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নতুন ঋণ সুবিধা সময়োপযোগী হলেও অনেক সময় নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীরাও ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, সরকার যদি পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে চামড়াশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চামড়াশিল্পে দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে সরকার এবার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। ঋণ সুবিধা, লবণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। এখন বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়।

