বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ এখনো অতিরিক্ত জটিল ও ব্যয়বহুল বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং বন্দরের কম দক্ষতার কারণে দেশের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে সরকার বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রদর্শনীর আয়োজন করে এক্সপোনেট এক্সিবিশন প্রাইভেট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে একজন উদ্যোক্তাকে প্রায় ২৭ ধরনের লাইসেন্স ও অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে যায়। তিনি মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি সমাধান দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের আগে অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব গড় প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্য পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত খরচ ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে বন্দরের ধীরগতি আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অপারেটরদের যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি কনটেইনার টার্মিনালে ইতোমধ্যে ডেনমার্কের একটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অংশীদারিত্ব আরও বাড়ানো হবে, যাতে পণ্য খালাসের সময় কমে এবং ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাস পায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো বিশাল জমি ব্যবহার করলেও উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অবদান খুব কম। সরকার আগামী দুই বছরের মধ্যে এসব শিল্প সম্পদ বেসরকারি বিনিয়োগের আওতায় এনে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করতে চায়।
বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল, পাট ও টেক্সটাইল খাতের অনেক কারখানা পুরোনো অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গড়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেগুলো আধুনিকায়ন অথবা নতুনভাবে ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে। অব্যবহৃত শিল্পভূমিকে বহুমুখী উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব বলেও মত দেন তিনি।
প্যাকেজিং শিল্পের সম্ভাবনার দিক তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে এই খাতের বাজারমূল্য ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বাংলাদেশ চাইলে এখান থেকে বড় অংশ অর্জন করতে পারে। তিনি উদ্যোক্তাদের আরও বড় পরিসরে ভাবার আহ্বান জানিয়ে সরকারের নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর বলেন, দেশের প্যাকেজিং শিল্প এখন প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার বাজারে পরিণত হয়েছে এবং স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। তিনি জানান, বিশ্ব প্যাকেজিং বাজার বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তার মতে, বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তাহলে বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় সম্ভব। তিনি প্যাকেজিং শিল্পকে বড় ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলোর ‘অদৃশ্য শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তৈরি পোশাক শিল্পের মতো এই খাতও আন্তর্জাতিক সাফল্য পেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে খাতটির বিকাশে কিছু নীতিগত বাধার কথাও তুলে ধরেন তিনি। দ্বৈত কর ব্যবস্থা, কর ফেরত পেতে জটিলতা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অসম প্রতিযোগিতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে প্যাকেজিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য কাগজ ও প্যাকেজিং পণ্যকে ‘বর্ষসেরা পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক প্যাকেজিং প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণে সহায়তা দেওয়া হবে। এতে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রদর্শনীর আয়োজক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক জানান, এবারের মেলায় দেশি-বিদেশি ১৪০টি প্রতিষ্ঠান ৩৬০টি স্টলের মাধ্যমে তাদের পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করছে। এর মধ্যে চীনের ২৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। ৯ মে পর্যন্ত এই প্রদর্শনী চলবে।

